আত্মার উৎস সন্ধানে :

আত্মার ধারণা অনেক পুরোন। যখন থেকে মানুষ নিজের অস্তিত্ব নিয়ে অনুসন্ধিৎসু হয়েছে, নিজের জীবন নিয়ে কিংবা মৃত্যু নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে, জীবন জগতের বিভিন্ন রহস্যে হয়েছে উদ্বেলিত, তার ক্রমিক পরিনতি হিসেবেই এক সময় মানব মনে আত্মার ধারণা উঠে এসেছে। আসলে জীবিত প্রাণ থেকে জড়জগৎকে পৃথক করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহজ সমাধান হিসেবে আত্মার ধারণা একটা সময় গ্রহণ করে নেওয়া হয়েছিল বলে মনে করা হয়। আদিকাল থেকেই মানুষ ইট, কাঠ, পাথর যেমনি দেখেছে, ঠিক তেমনিভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে চারপাশের বর্ণাঢ্য জীবজগতকে। ইট, পাথর বা অন্যান্য জড় পদার্থের যে জীবনীশক্তি নেই, নেই কোন চিন্তা করার ক্ষমতা তা বুঝতে তার সময় লাগেনি। অবাক বিস্ময়ে সে ভেবেছে - তাহলে জীবগতের যে চিন্তা করার কিংবা চলে ফিরে বেড়াবার ক্ষমতাটি রয়েছে, তার জন্য নিশ্চয় বাইরে থেকে কোন আলাদা উপাদান যোগ করতে হয়েছে। আত্মা নামক অপার্থিব উপাদানটিই সে শুন্যস্থান তাদের জন্য পূরণ করেছে, তারা রাতারাতি পেয়ে গেছে জীবন-মৃত্যুকে ব্যাখ্যা করার খুব সহজ একটা সমাধান।


চিত্র : ক) নিয়ান্ডার্থালদের মৃতদেহ কবর দেওয়ার সময় পারলৌকিক আচার আচরণ খ) শানিদার গুহায় পাওয়া ফসিলের অবশেষ।

এখন পর্যন্ত জানা তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, আত্মা দিয়ে জীবন মৃত্যুকে ব্যাখ্যা করার করার প্রচেষ্টা প্রথম শুরু হয়েছিলো সম্ভবতঃ নিয়ান্ডার্থাল মানুষের আমলে - যারা পৃথিবীতে রাজত্ব করেছে এখন থেকে প্রায় আড়াই লক্ষ বছর আগে। নিয়ানডার্থাল মানুষের আগে পিথেকানথ্রোপাস আর সিনানথ্রোপাসদের মধ্যে এ ধরনের ধর্মাচরণের কোন নিদর্শন পাওয়া যায় নি। তবে নিয়ান্ডার্থাল মানুষের বিশ্বাসগুলো ছিল একেবারেই আদিম- আজকের দিনের প্রচলিত ধর্মমতগুলোর তুলনায় অনেক সরল। ইরাকের শানিদার নামের একটি গুহায় নিয়ান্ডার্থাল মানুষের বেশ কিছু ফসিল পাওয়া গেছে যা দেখে অনুমান করা যায় যে, নিয়ান্ডার্থালরা প্রিয়জন মারা গেলে তার আত্মার উদ্দেশ্যে ফুল নিবেদন করতো। এমনকি তারা মৃতদেহ কবর দেয়ার সময় এর সাথে পুষ্পরেণু, খাদ্যদ্রব্য, অস্ত্র সামগ্রী, শিয়ালের দাঁত এমনকি মাদুলীসহ সব কিছুই দিয়ে দিত যাতে পরপারে তাদের আত্মা শান্তিতে থাকতে পারে আর সঙ্গে আনা জিনিসগুলো ব্যবহার করতে পারে। অনেক গবেষক (যেমন নিলসন গেসছিটি, রবার্ট হার্টস প্রমুখ) মনে করেন, মৃতদেহ নিয়ে আদি মানুষের পারলৌকিক ধর্মাচরণের ফলশ্রুতিতেই মানব সমাজে ধীরে ধীরে আত্মার উদ্ভব ঘটেছে।

আত্মা নিয়ে হরেক রকম গপ্প:

জীবন মৃত্যুর যোগসূত্র খুঁজতে গিয়ে আত্মাকে ‘আবিস্কার’ করলেও সেই আত্মা কি করে একটি জীবদেহে প্রাণসঞ্চার করে কিংবা চিন্তা-চেতনার উন্মেষ ঘটায় তা নিয়ে প্রাচীন মানুষেরা একমত হতে পারেনি। ফলে জন্ম নিয়েছে নানা ধরনের গাল গপ্প, লোককথা আর উপকথার। পরবর্তীতে এর সাথে যোগ হয়েছে নানা ধরনের ধর্মীয় কাহিনীর। জন্ম হয়েছে আধ্যাত্মবাদ আর ভাববাদের, তারপর সেগুলো সময়ের সাথে সাথে আমাদের সংস্কৃতির সাথে মিলে মিশে এমনভাবে একাকার হয়ে গেছে যে আত্মা ছাড়া জীবন-মৃত্যুকে সংজ্ঞায়িত করাই অনেকের জন্য অসম্ভব ব্যাপার। আত্মা নিয়ে কিছু মজার কাহিনী এবারে শোনা যাক।

জাপানীরা বিশ্বাস করে একজন মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন তার ভেতরের আত্মা খুব ছোট পতঙ্গের আকার ধারণ করে তার হা করা মুখ দিয়ে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। তারপর যখন ওই আত্মা নামক পোকাটি ঘুরে ফিরে আবার হামগুড়ি দিয়ে মুখ বেয়ে দেহের ভিতরে প্রবেশ করে তখনই ওই মানুষটি ঘুম থেকে জেগে উঠে১, ৪। মৃত্যুর ব্যাখ্যাও এক্ষেত্রে খুব সহজ। মুখ দিয়ে বেরিয়ে পোকাটি আর যদি কোন কারণে ফেলে আসা দেহে ঢুকতে বা ফিরতে না পারে, তবে লোকটির মৃত্যু হয়। অনেক সময় ঘুমন্ত মানুষের অস্বাভাবিক স্বপ্নদেখাকেও আত্মার অস্তিত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করতেন প্রাচীন মানুষেরা। তারা ভাবতেন, ঘুমিয়ে পড়লে মানুষের আত্মা ‘স্বপ্নের দেশে’ পাড়ি জমায়। আর তারপর স্বপ্নের দেশ থেকে আবার ঘুমন্ত মানুষের দেহে আত্মা ফেরত এলে মানুষটি ঘুম থেকে জেগে উঠে। আত্মা নিয়ে এধরনের নানা বিশ্বাস আর লোককথা ইউরোপ, এশিয়া আর আফ্রিকায় ছড়িয়ে ছিল।

আত্মার এক ধরণের প্রাগৈতিহাসিক ধারণা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী অ্যাবরোজিনসদের মধ্যে প্রচলিত ছিল৭। প্রায় চল্লিশ হাজার বছর আগে অ্যাবরোজিনসরা অস্ট্রেলিয়ার মূল ভুখন্ডে আসার পর অনেকদিন বাইরের জগতের সাথে বিচ্ছিন্ন ছিল। ফলে তাদের সংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছিল চারপাশের পৃথিবী থেকে একটু ভিন্নভাবে। তাদের আত্মার ধারণাও ছিল বাইরের পৃথিবী থেকে ভিন্ন রকেমের। তাদের আত্মা ছিল যোদ্ধা প্রকৃতির। তীর-ধনুকের বদলে বুমেরাং ব্যবহার করত। কোন কোন অ্যাবরোজিন এও বিশ্বাস করত যে, তাদের গোত্রের নতুন সদস্যরা আত্মাদের পুনরায় ব্যবহার করতে পারত। ঠিক একইভাবে প্রায় বার হাজার বছর আগেকার আদিবাসী আমেরিকানদের মধ্যেও আত্মা নিয়ে বিশ্বাস প্রচলিত ছিল, যা প্রকারন্তরে তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ধ্যান ধারণার অভিযোজনকেই তুলে ধরে। আফ্রিকার কালোমানুষদের মতে সকল মানুষের আত্মার রং কালো রং-এর। আবার মালয়ের বহু মানুষের ধারণা, আত্মার রঙ রক্তের মতই লাল, আর আয়তনে ভুট্টার দানার মত। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের অনেকের ধারণা আত্মা আসলে তরল। অস্ট্রেলিয়ার অনেকে আবার মনে করে আত্মা থাকে বুকের ভিতরে, হৃদয়ের গভীরে; আয়তনে অবশ্যই খুবই ছোট । কাজেই এটুকু বলা যায়, আত্মায় বিশ্বাসীরা নিজেরাই আত্মার সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞার ব্যাপারে একমত নন। আত্মা নিয়ে প্রচলিত পরস্পর-বিরোধী গাল-গপ্পগুলো সেই সাক্ষ্যই দেয়।

ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, হিব্রু, পারশিয়ান আর গ্রীকদের মধ্যে আত্মা নিয়ে বহুধরনের বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। প্রথম দিকে - অন্ততঃ খ্রীষ্টপূর্ব ছয় শতক পর্যন্ত তো বটেই- হিব্রু, ফোয়েনিকানস আর ব্যবলনীয়, গ্রীক এবং রোমাদের মধ্যে মৃত্যু-পরবর্তী আত্মার কোন স্বচ্ছ ধারণা গড়ে ওঠেনি । তারা ভাবতেন মানুষের আত্মা একধরনের সজ্ঞাবিহীন ছায়া সদৃশ (shadowy entity) অসম্পূর্ণ সত্তা, পূর্ণাংগ কিছু নয়। গবেষক ব্রেমার আত্মা নিয়ে প্রাচীন ধারণাগুলো সম্বন্ধে বলেন, ‘মোটের উপর আত্মাগুলো ছিল চেতনাবিহীন ছায়া ছায়া জিনিস, পূর্ণাংগ সত্তা তৈরি করার মত গুণাবলীর অভাব ছিল তাতে’ ।

সম্ভবতঃ জরথ্রুস্ট্র ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যার আত্মা সংক্রান্ত চিন্তা ভাবনা আধুনিক আধ্যাত্মবাদীদের দেওয়া আত্মার ধারণার অনেকটা কাছাকাছি। জরথ্রুস্ট্র ছিলেন খ্রীষ্টপূর্ব ৬০০ বছর আগেকার একজন পারশিয়ান। তার মতানুযায়ী, প্রতিটি মানুষ তৈরি হয় দেহ এবং আত্মার সমন্বয়ে, এবং আত্মার কল্যানেই আমরা যুক্তি, বোধ, সচেতনতা এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে পারি। জরথ্রুস্ট্রবাদীদের মতে, প্রতিটি মানুষই নিজের ইচ্ছানুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ কর্ম করার অধিকারী, এবং সে অনুযায়ী, তার ভাল কাজ কিংবা মন্দকাজের উপর ভিত্তি করে তার আত্মাকে পুরষ্কৃত করা হবে কিংবা শাস্তি প্রদান করা হবে। জরথ্রুস্ট্রের দেওয়া আত্মার ধারণাই পরবর্তীকালে গ্রীক এথেনীয় দার্শনিকেরা এবং আরো পরে খ্রীষ্ট ও ইসলাম ধর্ম তাদের দর্শনের অংগীভুত করে নেয়। খ্রীষ্টধর্মে আত্মার ধারণা গড়ে ওঠে সেন্ট অগাস্টিনের হাতে। জরথ্রুস্ট্রের মৃত্যুর প্রায় এক হাজার বছর পর অত্যন্ত প্রভাবশালী ধর্মবেত্তা সেন্ট অগাস্টিন খ্রীষ্টধর্মের ভিত্তি হিসেবে একই ধরণের (মানুষ = দেহ + আত্মা) যুক্তির অবতারণা করেন। এই ধারণাই পরবর্তিতে অস্তিত্বের দৈত্বতা (dulaliy) হিসবে খ্রীষ্ট ধর্মের দার্শনিক ভিত্তি প্রদান করে। এর সাথে যোগ হয় পাপ-পূণ্য এবং পরকালে আত্মার স্বর্গবাস বা নরকবাসের হরেকরকেরম গালগপ্প। এগুলোই পরে ডালপালায় পল্লবিত হয়ে পরে ইসলাম ধর্মেও স্থান করে নেয়। সন্দেহ করা হয়, প্রাথমিকভাবে অগাস্টিন জরথ্রুস্ট্রবাদীদের কাছ থেকেই আত্মার ধারণা পেয়েছিলেন, কারণ খ্রীষ্টধর্মগ্রহন করার আগ পর্যন্ত নয় বছর অগাস্টিন ম্যানিকিন (Manchean) গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যাদের মধ্যে জরথ্রুস্ট্রবাদের প্রভাব বিদ্যমান ছিল পুরোমাত্রায়।

হিব্রু এবং গ্রীকদের মধ্যে প্রথম দিকে আত্মা নিয়ে কোন সংহত ধারণা ছিল না । এই অসংহত ধারণার প্রকাশ পাওয়া যায় হোমারের (খ্রীষ্টপূর্ব ৮৫০) রচনায় - সাইকি (Psyche) শব্দটির উল্লেখে। হোমারের বর্ণনানুযায়ী, কোন লোক মারা গেলে বা অচেতন হয়ে পরলে ‘সাইকি’ তার দেহ থেকে চলে যায়। তবে সেই সাইকির সাথে আজকের দিনে প্রচলিত আত্মার ধারণার পার্থক্য অনেক। হোমারের সাইকি ছিল সজ্ঞাবিহীন ছায়া সদৃশ অসম্পূর্ণ সত্তা; এর আবেগ, অনুভূতি কিংবা চিন্তাশক্তি কিছুই ছিল না । ছিল না পরকালে আত্মার পাপ-পূণ্যের হিসাব।

এর মাঝে গ্রীসের অয়োনীয় যুগের বিজ্ঞানীরা বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে জীবণ মৃত্যুকে ব্যাখ্যা করতে প্রয়াসী হন। ভাববাদের কচকচানি এড়িয়ে প্রথম যে গ্রীক দার্শনিক জীবনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হলেন, তাঁর নাম থেলিস (৬২৪-৫৪৭ খ্রী.পূ.)। থেলিসের বক্তব্য ছিল, বস্তু মাত্রই প্রাণের সুপ্ত আধার। উপযুক্ত পরিবেশে বস্তুর মধ্যে নিহিত প্রাণ আত্মপ্রকাশ করে। পরমাণু তত্ত্বের প্রবক্তা ডেমোক্রিটাস (৪৬০-৩৭০ খ্রী.পূ.) প্রাণের সাথে বস্তুর নৈকট্যকে আরো বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করেন। ডেমোক্রিটাস বলতেন, সমগ্র বস্তুজগৎ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অবিভাজ্য কণা দিয়ে গঠিত। তিনি সে কণিকাগুলোর নাম দিলেন অ্যাটম বা পরমাণু। তিনি শুধু সেখানেই থেমে থাকেননি, তার পরমাণু তত্ত্বকে নিয়ে গেছেন প্রাণের উৎপত্তির ব্যাখ্যাতেও। তিনি বলতেন, কাদা মাটি বা আবর্জনা থেকে যখন প্রাণের উদ্ভব হয় তখন অজৈব পদার্থের অনুগুলো সুনির্দিষ্টভাবে সজ্জিত হয়ে জীবনের ভিত্তিভুমি তৈরি করে। ডেমোক্রিটাসের প্রায় সমসাময়িক দার্শনিক লিউসেপ্পাসও (আনুমানিক ৫০০-৪৪০ খ্রী.পূ.) এধরণের বস্তুবাদী ধারণায় বিশ্বাস করতেন। তিনি বিজ্ঞানে তিনটি নতুন ধারণা চালু করেন –চরম শূন্যতা, চরম শূন্যতার মধ্য দিয়ে এটমের চলাফেরা এবং যান্ত্রিক প্রয়োজন। লিউসেপ্পাসই প্রথম বিজ্ঞানে কার্যকারণ তত্ত্বের জন্ম দেন বলে কথিত আছে । অয়োনীয় যুগের দর্শনের বস্তুবাদীরূপটিকে পরবর্তীতে আরো উন্নয়ন ঘটান এপিকিউরাস এবং লুক্রেশিয়াস, এবং তা দর্শন ও নীতিশাস্ত্রকেও প্রভাবিত করে। গ্রীক পরমাণুবাদ পরবর্তীকালে বিজ্ঞানকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিল। যেমন, প্রথম আধুনিক পরমাণুবিদ গ্যাসেন্ডি তার পরমাণুবাদ তৈরির জন্য ঋণ স্বীকার করেছেন ডেমোক্রিটাস এবং এপিকিউরাসের কাছে। গ্রীক পরমানূবাদ প্রভাবিত করেছিল পরবর্তীতে পদার্থবিদ নিউটন এবং রসায়নবিদ জন ড্যাল্টনকেও তাদের নিজ নিজ পরমাণু তত্ত্ব নির্মাণে।

কাজেই গ্রীসের অয়োনীয় যুগে মেইনস্ট্রীম দার্শিনিকদের চিন্তা চেতনা ছিল অনেকটাই বস্তুবাদী। কিন্তু পরে পারস্য দেশের প্রভাবে আত্মা সংক্রান্ত সব আধ্ম্যাতিক এবং ভাববাদী ধ্যান-ধারনা গ্রীকদের মধ্যে ঢুকে যায়। ভাববাদী দর্শনের তিন পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন সক্রেটিস, প্লেটো এবং অ্যারিস্টটল। এরা এথেন্সের সন্তান হলেও সে এথেন্স তখন অবক্ষয়ী এথেন্স। তারপরও পরবর্তী আড়াই হাজার বছর তাদের চিন্তা-চেতনা দিয়ে মানব সমাজ প্রভাবিত হয়েছিল। এদের ক্ষমতার কোন সীমা-পরিসীমা ছিল না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মানব ইতিহাসের প্রথম স্বাধীন নগরের বৈপ্লবিক মহত্ব থেকে তারা মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করার মত শক্তিধর হওয়া সত্ত্বেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে ক্ষমতাকে তারা প্রতিবিপ্লবের স্বার্থে ব্যবহার করতেন ২২ । তারা গণতন্ত্রের ভয়ে ভীত ছিলেন এবং গণতন্ত্রের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন। অয়োনীয় যুগের দার্শনিকেরা পলে পলে বস্তুবাদের যে সৌধ গড়ে তুলেছিলেন, তা এই তিন ভাববাদী দার্শনিকদের আগ্রাসনে বিলুপ্ত হয়। বস্তুবাদকে সরিয়ে মূলতঃ রহস্যবাদী উপাদানকে হাজির করে তারা তাদের দর্শন গড়ে তুলেন। প্লেটোর বক্তব্য ছিল যে, প্রাণী বা উদ্ভিদ কেউ জীবিত নয়, কেবলমাত্র যখন আত্মা প্রাণী বা উদ্ভিদদেহে প্রবেশ করে তখনই তাতে জীবনের লক্ষণ পরিস্ফুট হয়। প্লেটোর এ সমস্ত তত্ত্বকথাই পরবর্তীতে খ্রীস্টধর্মের বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থনের যোগান দেয়। প্লেটোর এই ভাববাদী তত্ত্ব আ্যারিস্টটলের দর্শনের রূপ নিয়ে পরবর্তীতে হাজারখানেক বছর রাজত্ব করে। এখন প্রায় সব ধর্মমতই দার্শনিক-যুগলের ভাববাদী ধারণার সাথে সঙ্গতি বিধান করে। আত্মা সংক্রান্ত কুসংসস্কার শেষপর্যন্ত মানব সমাজে ধীরে ধীরে জাঁকিয়ে বসে।

আত্মার অসারতা :

জীব কী আর জড় কী? বুঝব কি করে ক্যাডা জীব আর ক্যাডা জড়? জীবিতদের কি ভাবে সনাক্ত করা যায়? একটি মৃতদেহ আর একটি জীবিত দেহের মধ্যে পার্থক্যই বা কি? এ প্রশ্নগুলো দিয়ে আগেকার দিনের মানুষের অনুসন্ধিৎসু মন সবসময়ই আন্দোলিত হয়েছে পুরোমাত্রায়। কিন্তু এই প্রশ্নগুলোর কোন সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পেয়ে তারা শেষপর্যন্ত কল্পনা করে নিয়েছে অদৃশ্য আত্মার । ভেবেছে আত্মাই বুঝি জীবন ও মৃত্যুর যোগসূত্র। প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের ভাববাদী ধ্যানধারণাগুলো কালের পরিক্রমায় বিভিন্ন ধর্মে জায়গা করে নেওয়ার পর জীবন-মৃত্যুর সংজ্ঞা ধর্মীয় মিথের আবরণে পাখা মেলতে শুরু করল। কল্পনার ফানুস উড়িয়ে মানুষ ভাবতে শুরু করল, ঈশ্বরের নির্দেশে আজরাইল বা যমদূত এসে প্রাণহরণ করলেই কেবল একটি মানুষ মারা যায়। আর তখন তার দেহস্থিত আত্মা পাড়ি জমায় পরলোকে। মৃত্যু নিয়ে মানুষের এ ধরনের ভাববাদী চিন্তা জন্ম দিয়েছে আধ্যাত্মবাদের। আধ্যাত্মবাদ স্বতঃপ্রমাণ হিসেবেই ধরে নেয়-‘আত্মা জন্মহীন, নিত্য, অক্ষয়। শরীর হত হলেও আত্মা হত হয় না।’ মজার ব্যাপার হল, একদিকে যেমন আত্মাকে অমর অক্ষয় বলা হচ্ছে, জোর গলায় প্রচার করা হচ্ছে আত্মাকে কাটা যায় না, পোড়ানো যায় না, আবার সেই আত্মাকেই পাপের শাস্তিস্বরূপ নরকে ধারলো অস্ত্র দিয়ে কাটা, গরম তেলে পোড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ সবই আধ্যাত্মবাদের স্ববিরোধিতা। ধর্মগ্রন্থগুলি ঘাটলেই এ ধরনের স্ববিরোধিতার হাজারো দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে। স্ববিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও আত্মার অস্তিত্ব দিয়ে জীবনকে ব্যাখ্যা করতে প্রয়াসী হয়েছে মানুষ। কারণ সে সময় বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ছিল সীমিত। মৃত্যুর সঠিক কারণ ছিল তাদের জানার বাইরে। সেজন্য অনেক ধর্মবাদীরাই ‘আত্মা’ কিংবা ‘মন’ কে জীবনের আধাররূপী বস্তু হিসেবে কল্পনা করেছেন। যেমন, ইসলামিক মিথ্‌ বলছে, আল্লাহ মানবজাতির সকল আত্মা একটি নির্দিষ্ট দিনে তৈরী করে বেহেস্তে একটি নির্দিষ্ট স্থানে (ইল্লিন) বন্দি করে রেখে দিয়েছেন। আল্লাহর ইচ্ছাতেই নতুন নতুন প্রাণ সঞ্চারের জন্য একেকটি আত্মাকে তুলে নিয়ে মর্তে পাঠানো হয়। আবার আচার্য শঙ্কর তার ব্রক্ষ্মসূত্রভাষ্যে বলেছেন, ‘মন হল আত্মার উপাধি স্বরূপ’। ওদিকে আবার সাংখ্যদর্শনের মতে - ‘আত্মা চৈতন্যস্বরূপ’ (সাংখ্যসুত্র ৫/৬৯)। জৈন দর্শনে বলা হয়েছে, ‘চৈতন্যই জীবের লক্ষণ বা আত্মার ধর্ম।’ (ষড়দর্শন সমুচ্চয়, পৃঃ ৫০) স্বামী বিবেকানন্দ পর্যন্ত ভাবতেন, ‘চৈতন্য বা চেতনাই আত্মা।’ (বিবেকানন্দ রচনা সমগ্র, পৃঃ ১৬২) স্বামী অভেদানন্দের মতে, ‘আত্মা বা মন মস্তিস্ক বহির্ভুত পদার্থ, মস্তিষ্কজাত নয়।’ (মরণের পারে, পৃঃ ৯৮)। গ্রীক দর্শনেও আমরা প্রায় একই রকম ভাববাদী দর্শনের ছায়া দেখতে পাই, যা আগের অংশে আমারা আলোচনা করেছি। অ্যারিস্টটলের পরবর্তী গ্রীক ও রোমান দার্শনিকেরা অ্যারিস্টটলীয় দর্শনকে প্রসারিত করে পরবর্তী যুগের চাহিদার উপযোগী করে তোলেন। খ্রীষ্টিয় তৃতীয় শতকে নয়া প্লেটোবাদীরা ‘ঈশ্বর অজৈব বস্তুর মধ্যে জীবন সৃষ্টিকারী আত্মা প্রবেশ করিয়ে দিয়ে তাকে জীবন দান করেন’ - এই মত প্রচার করতে শুরু করেন। নয়া প্লেটোবাদী প্লাটিনাসের মতে, ‘জীবনদায়ী শক্তিই জীবনের মূল।’ বস্তুতপক্ষে, জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ‘জীবনশক্তি’ (life force) তত্ত্ব এখান থেকেই যাত্রা শুরু করে এবং জীবনের উৎপত্তি প্রসঙ্গে ভাববাদী দর্শনের ভিত্তিও জোরালো হয়। ধর্মবাদী চিন্তা, বৈজ্ঞানিক অনগ্রসরতা, কুসংস্কার, ভয় সব কিছু মিলে শিক্ষিত সমাজে এই ভাববাদী চিন্তাধারার দ্রুত প্রসার ঘটে।

বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি আর যুক্তির প্রসারের ফলে আজ কিন্তু আত্মা দিয়ে জীবন-মৃত্যুকে ব্যাখ্যা করার অন্তর্নিহিত ত্রুটিগুলো মানুষের চোখে সহজেই ধরা পড়ছে। যদি জীবনকে ‘আত্মার উপস্থিতি’ আর মৃত্যুকে ‘আত্মার দেহত্যাগ’ দিয়েই ব্যাখ্যা করা হয়, তবে তো যে কোন জীবিত সত্ত্বারই - তা সে উদ্ভিদই হোক আর প্রাণীই হোক- আত্মা থাকা উচিৎ। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে একটি দেহে কি কেবল একটিমাত্র আত্মা থাকবে নাকি একাধিক? যেমন, বেশ কিছু উদ্ভিদ - গোলাপ, কলা, ঘাসফুল এমন কি হাইড্রা, কোরালের মত প্রাণীরাও কর্তন (Cut) ও অঙ্কুরোদগোমের (Bud) মাধ্যমে বিস্তৃত হয়। তাহলে কি সাথে সাথে আত্মাও কর্তিত হয়, নাকি একাধিক আত্মা সাথে সাথেই অঙ্কুরিত হয়? আবার মাঝে মধ্যেই দেখা যায় যে, পানিতে ডুবে যাওয়া, শ্বাসরুদ্ধ, মৃত বলে মনে হওয়া/ঘোষিত হওয়া অচেতন ব্যক্তির জ্ঞান চিকিৎসার মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত মোটেই বিরল নয় - তখন কি দেহত্যাগী বৈরাগী আত্মাকেও সেই সাথে ডেকে ঘরে থুড়ি দেহে ফিরিয়ে আনা হয়? প্রজননকালে পিতৃদত্ত শুক্রানু আর মাতৃদত্ত ডিম্বানুর মিলনে শিশুর দেহকোষ তৈরী হয়। শুক্রানু আর ডিম্বানু জীবনের মূল, তাহলে নিশ্চয় তাদের আত্মাও আছে। এদের আত্মা কি তাদের আভিভাবকদের আত্মা থেকে আলাদা? যদি তাই হয় তবে কিভাবে দুটি পৃথক আত্মা পরষ্পর মিলিত হয়ে শিশুর দেহে একটি সম্পূর্ণ নতুন আত্মার জন্ম দিতে পারে? মানব মনের এ ধরনের অসংখ্য যৌক্তিক প্রশ্ন আত্মার অসারত্বকেই ধীরে ধীরে উন্মোচিত করেছে।

আত্মার সংজ্ঞাতেও আছে বিস্তর গোলমাল। কেউ আত্মার চেহারা বায়বীয় ভাবলেও (স্বামী অভেদানন্দের মরণের পারে দ্রঃ) কেউ আবার ভাবেন তরল (প্রশান্ত মহাসাগরের অধিবাসী); কেউ আত্মার রঙ লাল (মালয়ের অধিবাসী) ভাবলেও অন্য অনেকে ভাবেন কালো (আফ্রিকাবাসী এবং জাপানীদের অনেকের এ ধরণের বিশ্বাস রয়েছে)। বিদেহী আত্মার পুনর্জন্ম নিয়ে গোলমাল আরো বেশি। বিশ্বের প্রধান ধর্মমত হিসেবে হিন্দু, ইসলাম এবং খ্রীষ্ট ধর্মের কথা আলোচনা করা যাক। হিন্দুরা আত্মার পুনর্জন্মে বিশ্বাস করে; আবার অপরদিকে মুসলিম আর খ্রীষ্টানদের কাছে আত্মার পুনর্জন্ম বলে কিছু নেই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রত্যেকটি ধর্ম তাদের বিশ্বাসকেই অভ্রান্ত বলে মনে করে। এ প্রসঙ্গে প্রবীর ঘোষ তার ‘অলৌকিক নয়, লৌকিক’ গ্রন্থে বলেন ,

‘একবার ভাবুন তো, আত্মার চেহারাটা কেমন, তাই নিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন দেশবাসীর বিভিন্ন মত। অথচ স্বামী অভেদানন্দই এক জায়গায় বলেছেন, ‘আমাদের মনে রাখা উচিৎ যে, সত্য কখনো দু’রকমের বা বিচিত্র রকমের হয় না, সত্য চিরকালই এক ও অখন্ড।’

বিবর্তনতত্ত্ব মানতে গেলে তো আত্মার অস্তিত্ব এবং পুনর্জন্মকে ভালমতই প্রশ্নবিদ্ধ করতে হয়। বিজ্ঞান আজ প্রমাণ করেছে জড় থেকেই জীবের উদ্ভব ঘটেছিল পৃথিবীর বিশেষ ভৌত অবস্থায় নানারকম রাসায়নিক বিক্রিয়ার জটিল সংশ্লেষের মধ্য দিয়ে আর তারপর বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভব ঘটেছে জৈববিবর্তনের বন্ধুর পথে। এই প্রাণের উদ্ভব এবং পরে প্রজাতির উদ্ভবের পেছনে কোন মন বা আত্মার অস্তিত্ব ছিল না। প্রাণের উদ্ভবের পর কোটি কোটি বছর কেটে গেছে, আর আধুনিক মানুষ তো এল –এই সেদিন – মাত্র পচিশ থেকে ত্রিশ হাজার বছর আগে। তাহলে এখন প্রশ্ন হতে পারে ত্রিশ বছর আগে মানুষের আত্মারা কোথায় ছিল? জীবজন্তু কিংবা কীটপতঙ্গ হয়ে? কোন পাপে তাহলে আত্মারা কীটপতঙ্গ হল? পূর্বজন্মের কোন কর্মফলে এমনটি হল? পূর্বজন্ম পূর্বজন্ম করে পেছাতে থাকলে যে প্রাণীতে আত্মার প্রথম জন্মটি হয়েছিল সেটি কবে হয়েছিল? হলে নিশ্চয়ই এককোষী সরল প্রাণ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিল। এককোষী প্রাণের জন্ম হয়েছিল কোন জন্মের কর্মফলে?

বিবর্তনের আধুনিক তত্ত্ব না জানা সত্ত্বেও প্রাচীন ভারতের যুক্তিবাদী চার্বাকেরা সেই খ্রীষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে তাদের সেসময়কার অর্জিত জ্ঞানের সাহায্যে আত্মার অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছিলেন। আত্মাকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়েই সম্ভবতঃ চার্বাকদের লড়াইটা শুরু হয়েছিল। আত্মাই যদি না থাকবে তবে কেন অযথা স্বর্গ নরকের কেচ্ছা-কাহিনীর আমদানী। আত্মা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতে করতে শেষ পর্যন্ত ঠোঁট কাটা চার্বাকেরা ঈশ্বর-আত্মা-পরলোক-জাতিভেদ-জন্মান্তর সব কিছুকেই তারা নাকচ করে দেন। তারাই প্রথম বলেছিলেন বেদ ‘অপৌরুষেয়’ নয়, এটা একদল স্বার্থান্নেষী মানুষেরই রচিত। জনমানুষের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া সেই সব স্বার্থান্নেষী ব্রাক্ষ্মণদের চার্বাকেরা ভন্ড, ধূর্ত, চোর, নিশাচর বলে অভিহিত করেছিলেন, তারা বাতিল করে দিয়েছিলেন আত্মার অস্তিত্ব, উন্মোচন করেছিলেন ধর্মের জুয়াচুরি এই বলে :

‘বেহেস্ত ও মোক্ষপ্রাপ্তি কি পরিত্রাণলাভ ফাঁকা অর্থহীন অসার বুলিমাত্র, উদরযন্ত্রে বিসর্পের কারণে সবেগে উৎক্ষিপ্ত দুর্গন্ধময় ঢেকুরমাত্র। এসব প্যাক প্যাক বা বাকচাতুরি নৈতিক অপরাধ, উন্মার্গ গমন, মানসিক ও দৈহিক ঔদার্যের ফলশ্রতি -পরান্নভোজী বমনপ্রবণ ব্যক্তিদের অদম্য কুৎসিৎ বমনমাত্র, পেটুকদের এবং উন্মার্গগামীদের বিলাস-কল্পণা। পরজগতে যাওয়ার জন্য কোন আত্মার অস্তিত্ব নেই। বর্ণাশ্রমের নির্দিষ্ট মেকি নিয়ম-আচার আসলে কোন ফল উৎপন্ন করে না। বর্ণাশ্রমের শেষ পরিনামের কাহিনী সাধারণ মানুষকে ঠকাবার উদ্দেশ্যে ধর্মকে গাঁজাবার খামি বিশেষ।’

চার্বাকেরা বলতেন, চতুর পুরোহিতদের দাবী অনুযায়ী যদি জ্যোতিষ্টোম যজ্ঞে বলিকৃত প্রাণী সরাসরি স্বর্গলাভ করে, তাহলে তারা নিজেদের পিতাকে এভাবে বলি দেয় না কেন? কেন তারা এভাবে তাদের পিতার স্বর্গপ্রাপ্তি নিশ্চিত করে না? :

যদি জ্যোতিষ্টোম যজ্ঞে
বলি দিলে পশু যায় স্বর্গে
তবে পিতাকে পাঠতে স্বর্গে
ধরে বেঁধে বলি দাও যজ্ঞে
।

চার্বাকেরা আরো বলতেন :

‘চৈতন্যরূপ আত্মার পাকযন্ত্র কোথা
তবে ত পিন্ডদান নেহাতই বৃথা
।’

কিংবা

যদি শ্রাদ্ধকর্ম হয় মৃতের তৃপ্তের কারণ
তবে নেভা প্রদীপে দিলে তেল, উচি
ৎ জ্বলন।

আত্মা বা চৈতন্যকে চার্বাকেরা তাদের দর্শনে আলাদা কিছু নয় বরং দেহধর্ম বলে বর্ণনা করেছিলেন। এই ব্যাপারটা এখন আধুনিক বিজ্ঞানও সমর্থন করে। পানির সিক্ততার ব্যাপারটা চিন্তা করুন। এই সিক্ততা জিনিসটা আলাদা কিছু নয় - বরং পানির অনুরই স্বভাব ধর্ম। ‘সিক্তাত্মা’ নামে কোন অপার্থিব সত্ত্বা কিন্তু পানির মধ্যে সেঁদিয়ে গিয়ে তাতে সিক্ততা নামক ধর্মটির জাগরণ ঘটাচ্ছে না। বরং পানির অণুর অঙ্গসজ্জার কারণেই ‘সিক্ত’তা নামের ব্যাপারটির অভ্যুদয় ঘটছে। চার্বাকেরা বলতেন, মানুষের চৈতন্য বা আত্মাও তাই। দেহের স্বভাব ধর্ম হিসেবেই আত্মা বা চৈতন্যের উদয় ঘটছে। কিভাবে এর অভ্যুদয় ঘটে? চার্বাকেরা একটি চমৎকার উপমা দিয়ে ব্যাপারটি বুঝিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আঙ্গুর এবং মদ তৈরির অন্যান্য উপাদানগুলোতে আলাদা করে কোন মদশক্তি নেই। কিন্তু সেই উপকরণগুলোই এক ধরণের বিশেষ প্রক্রিয়ায়র মাধ্যমে কোন পাত্রে মিলিত করার পরে এর একটি নতুন গুণ পাওয়া যাচ্ছে, যাকে আমরা বলছি মদ। আত্মা বা চৈতন্যও তেমনি। যিশু খ্রীষ্টের জন্মের প্রায় ৬০০ বছর আগের বস্তুবাদী দার্শনিকেরা এভাবেই তাদের ভাষায় ‘রাসায়নিক প্রক্রিয়ায়’ প্রাণের উদ্ভবকে ব্যাখ্যা করেছিলেন, কোন রকমের আত্মার অনুকল্প ছাড়াই। তাদের এই বক্তব্যই পরবর্তীতে ভাববাদী দার্শনিকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছিল।

আত্মা, মন এবং অমরত্ব : বিজ্ঞানের চোখে

ভাববাদীরা যাই বলুক না কেন স্কুলের পাঠ শেষ করা ছাত্রটিও আজ জানে, মন কোন ‘বস্তু’ নয়; বরং মানুষের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের কাজ কর্মের ফল। চোখের কাজ যেমন দেখা, কানের কাজ যেমন শ্রবণ করা, পাকস্থলীর কাজ যেমন খাদ্য হজম করা, তেমনি মস্তিস্ক কোষের কাজ হল চিন্তা করা। তাই নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ক্রিক তাঁর ‘The Astonishing Hypothesis: The Scientific Search for the Soul’ গ্রন্থে পরিস্কার করেই বলেন : ‘বিস্ময়কর অনুকল্পটি হল: আমার ‘আমিত্ব’, আমার উচ্ছ্বাস, বেদনা, স্মৃতি, আকাংখা, আমার সংবেদনশীলতা, আমার পরিচয় এবং আমার মুক্তবুদ্ধি এগুলো আসলে মস্তিস্কের স্নায়ুকোষ এবং তাদের আনুষঙ্গিক অণুগুলোর বিবিধ ব্যবহার ছাড়া আর কিছুই নয়।’ মানুষ চিন্তা করতে পারে বলেই নিজের ব্যক্তিত্বকে নিজের মত করে সাজাতে পারে, সত্য-মিথ্যের মিশেল দিয়ে কল্পণা করতে পারে তার ভিতরে ‘মন’ বলে সত্যই কোন পদার্থ আছে, অথবা আছে অদৃশ্য কোন আত্মার আশরীরী উপস্থিতি। মৃত্যুর পর দেহ বিলীন হয়। বিলীন হয় দেহাংশ, মস্তিস্ক স্নায়ুকোষ। আসলে মস্তিষ্ক স্নায়ুকোষের মৃত্যু মানেই কিন্তু ‘মন’ এর মৃত্যু, সেই সাথে মৃত্যু তথাকথিত আত্মার। অনেক সময় দেখা যায় দেহের অন্যান্য অংগ প্রত্যংগ ঠিকমত কর্মক্ষম আছে, কিন্তু মস্তিষ্কের কার্যকারিতা হারিয়ে গেছে। এ ধরনের অবস্থাকে বলে কোমা। মানুষের চেতনা তখন লুপ্ত হয়। মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা হারানোর ফলে জীবিত দেহ তখন অনেকটা জড়পদার্থের মতই আচরণ করে। তাহলে জীবন ও মৃত্যুর যোগসূত্রটি রক্ষা করছে কে? এ কি অশরীরী আত্মা, নাকি মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের সঠিক কর্মক্ষমতা?

এ পর্যায়ে বিখ্যাত ক্রিকেটার রমণ লাম্বার মৃত্যুর ঘটনাটি স্মরণ করা যাক। ১৯৯৮ সালের ২০ এ ফেব্রুয়ারী ঢাকা স্টেডিয়ামে (বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) লীগের খেলা চলাকালীন সময় মেহেরাব হোসেন অপির একটি পুল শট ফরওয়ার্ড শর্ট লেগে ফিল্ডিংরত লাম্বার মাথায় সজোরে আঘাত করে। প্রথমে মনে হয়েছিল তেমন কিছুই হয় নি। নিজেই হেঁটে প্যাভিলিয়নে ফিরলেন; কিন্তু অল্প কিছুক্ষণ পরই জ্ঞান হারালেন তিনি। চিকিৎসকেরা তাকে ক্লিনিকে ভর্তি করলেন। পরদিন ২১ এ ফেব্রুয়ারী তাকে পিজি হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হল। সেখানে তার অপারেশন হল, কিন্তু অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকেই যাচ্ছিল।


চিত্রঃ রমন লাম্বা - মেধামী ক্রিকেটারের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু

পরদিন ২২ এ ফেব্রুয়ারী ডাক্তাররা ঘোষণা করলেন যে, মস্তিষ্ক তার কার্যকারিতা হারিয়েছে। হার্ট-লাং মেশিনের সাহায্যে কৃত্রিমভাবে হৃৎপিন্ড এবং ফুসফুসের কাজ চলছিল।

২৩ ফেব্রুয়ারী বিকেল সাড়ে তিনটায় তার আইরিশ স্ত্রী কিমের উপস্থিতিতে হার্ট লাং মেশিন বন্ধ করে দিলেন চিকিৎসকেরা। থেমে গেল লাম্বার হৃৎস্পন্দন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর তারিখ কোনটি হওয়া উচিৎ? ২২ নাকি ২৩ ফেব্রুয়ারী? আর তার মৃত্যুক্ষণটি নির্ধারণ করলেন কারা? আজরাইল/যমদূত নাকি চিকিৎসারত ডাক্তারেরা?

এ ব্যাপারটি আরও ভালভাবে বুঝতে হলে মৃত্যু নিয়ে দু’চার কথা বলতেই হবে। জীবনের অনিবর্তনীয় পরিসমাপ্তিকে (Irreversible cessation of life) বলে মৃত্যু। কেন জীবের মৃত্যু হয়? কারণ মৃত্যুবরণের মাধ্যমে আমাদের জীবন তাপগতীয় স্থিতাবস্থা (thermodynamic equilibrium) প্রাপ্ত হয়। তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র মানতে গেলে জীবনের উদ্দেশ্য আর কিছুই নয় - নিবিষ্টচিত্তে এন্ট্রপি বাড়িয়ে চলা। আমাদের খাওয়া, দাওয়া, শয়ন, ভ্রমণ, মৈথুন, কিংবা হিমু্র ‘বালিকা দংশন’ কিংব সন্যাসীর কামরাঙ্গা কবিতা পাঠের আনন্দ – সব কিছুর পেছনেই থাকে মোটা দাগে কেবল একটি মাত্র উদ্দেশ্য – ফেইথফুলি এনট্রপি বাড়ানো – সেটা আমরা বুঝতে পারি আর নাই পারি! জন্মের পর থেকে সারা জীবন ধরে আমরা এনট্রপি বাড়িয়ে বাড়িয়ে প্রকৃতিতে তাপগতীয় অসাম্য তৈরি করি, আর শেষ মেষ পঞ্চত্ব প্রাপ্তির মাধ্যমে অন্যান্য জড় পদার্থের মত নিজেদের দেহকে তাপগতীয় স্থিতাবস্থায় নিয়ে আসি। কিন্তু কিভাবে এই স্থিতাবস্থার নির্দেশ আমরা বংশপরম্পরায় বহন করি? জীবিবিজ্ঞানের চোখে দেখলে, আমরা (উদ্ভিদ এবং প্রাণী) উত্তরাধিকার সূত্রে বিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের পূর্ব-পুরুষদের যারা যৌনসংযোগের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে প্রকৃতিতে টিকে রয়েছে তাদের থেকে মরণ জিন (Death Gene) প্রাপ্ত হয়েছি এবং বহন করে চলেছি। এই ধরনের জিন (মরণ জিন) তার পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পিত উপায়েই মৃত্যুকে ত্বরান্নিত করে চলেছে। যৌনজননের মাধ্যমে বংশবিস্তাররের ব্যাপারটিতে আমি এখানে গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ, যে সমস্ত প্রজাতি যৌনজননকে বংশবিস্তারের একটি মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে, তাদের ‘মৃত্যু’ নামক ব্যাপারটিকেও তার জীবগত বৈশিষ্ট হিসেবে গ্রহণ করে নিতে হয়েছে। দেখা গেছে স্তন্যপায়ী জীবের ক্ষেত্রে সেক্স-সেল বা যৌনকোষগুলোই (জীববিজ্ঞানীরা বলেন ‘জার্মপ্লাজম’) হচ্ছে একমাত্র কোষ যারা সরাসরি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে নিজেদের জিন সঞ্চারিত করে টিকে থাকে। জীবনের এই অংশটি অমর। কিন্তু সে তুলনায় সোমাটিক সেল দিয়ে তৈরী দেহকোষগুলো হয় স্বল্পায়ুর। অনেকে এই ব্যাপারটির নামকরণ করেছেন ‘প্রোগ্রামড্‌ডেথ’। এ যেন অনেকটা বেহুলা-লক্ষিন্দর কিংবা বাবর-হুমায়ূনের মত ব্যাপার-স্যাপার - জননকোষের অমরত্বকে পূর্ণতা দিতে গিয়ে দেহকোষকে বরণ করে নিতে হয়েছে মৃত্যুভাগ্য। প্রখ্যাত জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স হালকাচালে তার ‘সেলফিশ জিন’ বইয়ে বলেছেন, ‘মৃত্যু’ও বোধহয় সিফিলিস বা গনোরিয়ার মত একধরনের ‘সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজ’ যা আমরা বংশ পরম্পরায় সৃষ্টির শুরু থেকে বহন করে চলেছি! ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার মত সরল কোষী জীব যারা যৌন জনন নয়, বরং কোষ বিভাজনের মাধ্যমে প্রকৃতিতে টিকে আছে তারা কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই অমর। এদের দেহ কোষ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে বিভাজিত হয়, তার পর বিভাজিত অংশগুলিও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে পুনরায় বিভাজিত হয়; কোন অংশই আসলে সেভাবে ‘মৃত্যুবরণ’ করে না।

আবার অধিকাংশ ক্যান্সার কোষই অমর, অন্ততঃ তাত্ত্বিকভাবে তো বটেই। একটি সাধারণ কোষকে জীবদ্দশায় মোটামুটি গোটা পঞ্চাশেক বার কালচার বা পুরুৎপাদন করা যায়। এই হাফ-সেঞ্চুরির সীমাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘হেফ্লিক লিমিট’ (Hayflick Limit)। কখনো সখনো ক্যান্সারাক্রান্ত কোন কোন কোষে সংকীর্ণ টেলোমার থাকার কারণে এটি কোষস্থিত ডিএনএ’র মরণ জিনকে স্থায়ীভাবে ‘সুইচ অফ’ করিয়ে দেয় । এর ফলে এই কোষ তার আভ্যন্তরীন ‘হেফ্লিক’ লিমিটকে অতিক্রম করে যায়। তখন আক্ষরিকভাবেই অসংখ্যবার – মানে অসীম সংখ্যকবার সেই কোষকে কালচার করা সম্ভব। এই ব্যাপারটাই তাত্ত্বিকভাবে কোষটিকে প্রদান করে অমরত্ব। হেনরিয়েটা ল্যাকস নামে এক মহিলা ১৯৫২ সালে সার্ভিকাল ক্যান্সারে মারা যাওয়ার পর ডাক্তাররা ক্যান্সারাক্রান্ত দেহকোষটিকে সরিয়ে নিয়ে ল্যাবে রেখে দিয়েছিল। এই কোষের মরণজিন স্থায়ীভাবে ‘সুইচ অফ’ করা এবং কোষটি এখনো ল্যাবরেটরীর জারে বহাল তবিয়তে ‘জীবিত’ অবস্থায় আছে। প্রতিদিনই এই সেল থেকে কয়েশ বার করে সেল-কালচার করা হচ্ছে, এই কোষকে এখন ‘হেলা সেল’ নামে অভিহিত করা হয়। যদি কোন দিন ভবিষ্যত- প্রযুক্তি আর জৈবমুল্যবোধ (bioethics) আমাদের সেই সুযোগ দেয়, তবে আমরা হয়ত হেলাকোষ ক্লোন করে হেনরিয়েটাকে আবার আমাদের পৃথিবীতে ফেরত আনতে পারব।

আবার ব্রাইন শ্রিম্প (brine shrimp), গোলকৃমি বা নেমাটোড, কিংবা টার্ডিগ্রেডের মত কিছু প্রাণি আছে যারা মৃত্যুকে লুকিয়ে রাখতে পারে, জীববিজ্ঞানের ভাষায় এ অবস্থাকে বলে ‘ক্রিপ্টোবায়টিক স্টেট’। যেমন, ব্রাইন শ্রিম্পগুলো লবনাক্ত পানিতে সমানে বংশবৃদ্ধি করতে থাকে, কিন্তু পানি যখন শুকিয়ে যায়, তখন তারা ডিম্বানু উৎপাদন, এমনকি নিজেদের দেহের বৃদ্ধি কিংবা মেটাবলিজম পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। শ্রিম্পগুলোকে দেখতে তখন মৃত মনে হলেও এরা আসলে মৃত নয় – বরং এদের এই মরণাপন্ন মধ্যেও জীবনের বীজ লুকানো থাকে। এই অবস্থাটিকেই বলে ‘ক্রিপ্টোবায়টিক স্টেট’। আবার কখনো তারা পানি খুঁজে পেলে আবারো নতুন করে ‘নবজীবন প্রাপ্ত’ হয়। এদের অদ্ভুতুরে ব্যাপার স্যাপার অনেকটা ভাইরাসের মত। ভাইরাসের কথা আরেকবার চিন্তা করা যাক। ভাইরাস জীবণ ও জড়ের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান করে। ভাইরাসকে কেউ জড় বলতে পারেন, আবার জীবিত বলতেও বাঁধা নেই। এমনিতে ভাইরাস ‘মৃতবৎ’, তবে তারা ‘বেঁচে’ ওঠে অন্য জীবিত কোষকে আশ্রয় করে। ভাইরাসে থাকে প্রোটিনবাহী নিউক্লিয়িক এসিড। এই নিউক্লিয়িক এসিডই ভাইরাসের যাবতীয় বৈশিষ্ট্যের আধার। উপযুক্ত পোষক দেহ পাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা ‘ক্রিপ্টোবায়টিক স্টেট’-এ জীবনকে লুকিয়ে রাখে। আর তারপর উপযুক্ত দেহ পেলে আবারো কোষ বিভাজনের মাধ্যমে অমরত্বের খেলা চালিয়ে যেতে থাকে।

কাজেই দেখা যাচ্ছে ‘মৃত্যু’ ব্যাপারটি সব জীবের জন্যই অত্যাবশ্যকীয় নিয়ামক নয়। ভাইরাসের আনবিক সজ্জার মধ্যেই আসলে লুকিয়ে আছে অমরত্বের বীজ। এই অঙ্গসজ্জাই আসলে ডিএনএর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয় তারা কখন ঘাপটি মেরে ‘ক্রিপ্টোবায়টিক স্টেট’-এ পড়ে থাকবে, আর কখন নবজীবনের ঝর্ণাধারায় নিজেদের আলোকিত করবে। সে হিসেবে ভাইরাসেরা আক্ষরিক অর্থেই কিন্তু অমর – এরা স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে না। তবে মানুষের নিজের প্রয়োজনে রাসায়নিক জীবাণুনাশক ঔষধপত্রাদির উদ্ভাবন ও তার প্রয়োগে জীবাণুনাশের ব্যাপারটি এক্ষেত্রে আলাদা। ঔযধের প্রয়োগে আসলে এদের অংগসজ্জা ভেঙে দেওয়া হয়, যেন তারা আবার পুনর্জীবন প্রাপ্ত হয়ে রোগ ছড়াতে না পারে। ঠিক একই রকম ভাবে অত্যধিক বিকিরণ শক্তি প্রয়োগ করেও ভাইরাসের এই দেহগত অঙ্গসজ্জা ভেঙে দেওয়া যেতে পারে। এর ফলে এদের আনবিক গঠণ বিনষ্ট হবে এবং এদের জীবনের সুপ্ত আধার হারিয়ে যাবে। ফলে উপযুক্ত পরিবেশ পেলেও এরা আর পুনর্জীবনপ্রাপ্ত হবে না। যারা জীবন-মত্যুর ব্যাপারটিকে আরো ভালমত বিজ্ঞানের গভীরে গিয়ে বুঝতে চান তারা আনবিক জীববিজ্ঞানী উইলিয়াম সি ক্লার্কের লেখা ‘Sex and the Origins of Death’ বইটি পড়তে পারেন












Why Do We Have Religion Anyway? - Association for Psychological Science

Why Do We Have Religion Anyway? - Association for Psychological Science

Download Template Download Link:If you have any problem with downloading this file, please contact with us. We will fix the problem as soon as possible.

মনের মানুষঃ একটি ভালোলাগা চলচ্চিত্র, কিন্তু......

আমার খুব প্রিয় একজন লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর ‘মনের মানুষ’ উপন্যাসকে অবলম্বন করে আরেক প্রিয় চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ ছবি তৈরি করেছেন, নাম দিয়েছেন উপন্যাসের নামে ‘মনের মানুষ’। ছবিটি ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় ২০১০ সালের ৩রা ডিসেম্বর মুক্তি পেয়েছে। দেখবো দেখবো করে অনেক দেরীতে আমি ছবিটি দেখেছি, তাও সিনেমা হলে গিয়ে নয়। ছবিটি ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক সাধকদের মধ্যে অন্যতম বাউল সাধক লালন শাহের জীবন দর্শনকে নিয়ে নির্মিত। ছবিটি নিয়ে আমার কিছু বলার নেই, আমি চিত্র সমালোচক নই। আমি শুধুমাত্র ছবিটি দেখতে গিয়ে আমার অনুভুতি আর প্রাসঙ্গিক কিছু কথা লেখার জন্যই আজ লিখতে বসেছি।

ছবিটির প্রথমেই দেখানো হয়েছে একটি আপাতদৃষ্টিতে মৃতদেহ ভেলায় করে নদীতে ভেসে চলছে। তারপরেই দেখা গেলো লালন চন্দ্র কর নামে এক যুবকের সাথে সিরাজ সাঁইয়ের পরিচয় হয়। যুবকটি সিরাজ সাঁইকে তাঁর গাওয়া গানটার মানে জিজ্ঞেস করলে সাঁইয়ের একটা কথা আমার খুব ভালো লাগে, ‘আহম্মক ছাড়া কেউ গানের মানে খুঁজে না’। আমি নিজেও এইসব আধ্যত্মবাদী গানের মানে খুব একটা বুঝতে পারি না, মানে বোঝারও চেষ্টা করি না, কিন্তু শুনতে খুব ভালো লাগে, মন জুড়িয়ে যায়। তারমানে আমি আহাম্মক নই, তাই না!

এরপরেই দেখা গেলো লালন চন্দ্র কর নামের যুবকটিই হচ্ছে লালন শাহ। আমি এখানে একটূ হোঁচট খেলাম। আমি যতদূর জানতাম, লালন কোন ধর্মের অনুসারী ছিলেন বা তাঁর জন্মগত ধর্ম কি ছিলো, সেটা নিয়ে বিস্তর গবেষনা করেও জ্ঞানী গুণী গবেষকরা কোনো স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারেন নি। কেউ বলেন লালনের জন্ম যশোর জেলার ফুলবাড়ি গ্রামের একটি মুসলিম পরিবারে, আবার কারো মতে লালন কায়স্ত পরিবারের সন্তান যার পিতা মাধব এবং মাতা পদ্মাবতী। পরে লালন ধর্ম পরিবর্তন করেন। গবেষকদের একাংশ মনে করেন লালন মুসলিম তন্তুবায় পরিবারের সন্তান। পিতা দরিবুল্লাহ দেওয়ান, মাতার নাম আমিনা খাতুন। অর্থাৎ লালনের জন্ম সম্পর্কে আজো পর্যন্ত কোনো সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছানো সম্ভব হয় নি। লালন নিজেও বলেছেন,

“সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে
লালন কয় জাতের কিরুপ
দেখলাম না এই নজরে”।

অথবা,

“সবে বলে লালন ফকির হিন্দু কি যবন
লালন বলে আমার আমি
না জানি সন্ধান”।

সেখানে ছবিতে তাঁর হিন্দু ঘরে জন্মানো দেখানোটা প্রকৃত তথ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, তাই নয় কী?

একটু পরেই আমরা দেখতে পাই বৃদ্ধ লালন শাহ বজরাতে বসে আছেন, এক শহুরে কেতাদুরস্ত ব্যক্তি তাঁর পোর্ট্রেট আঁকছেন। একপর্যায়ে লালন ফকিরকে জিজ্ঞেস করছেন, “তুমি কী বাউল ফকির? কথায় কথায় গান বান্ধো? তুমি কে গো?” উনি লালন ফকিরকে সুধাচ্ছেন তুমি কে গো, অথচ তখনো আমরা জানতেই পারছি না এই কেতাদুরস্ত মানুষটি কে? অবশ্য কিছুপরের এক দৃশ্যে লালনের পোর্ট্রেটে স্বাক্ষর দেবার সময় দেখতে পাই মানুষটির নাম জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। দ্বারকানাথ ঠাকুরের পৌত্র ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পঞ্চম পুত্র জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জন্ম হয়েছিল কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর থেকে বারো বছরের ছোটো। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাঁকে উৎসাহ ও সঙ্গ দিয়ে তাঁর প্রতিভার পূর্ণ বিকাশে সহায়তা করেন। ছাত্রাবস্থাতেই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ থিয়েটারের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁর রচিত একটি নাটকের নাম ছিলো ‘সরোজিনী’। এই নাটকটির সাথে রবীন্দ্রনাথ কিছুটা জড়িত আছেন। নাটকটি যে ঘরে রচনা হত, তার পাশের ঘরে কিশোর রবীন্দ্রনাথ সংলাপ শুনতেন। সরোজিনী তৈরির সময় রবীন্দ্রনাথ প্রস্তাব করেন, সরোজিনী জ্বলন্ত আগুনে হেঁটে আত্মাহুতি দিতে যাচ্ছে এই দৃশ্যটির পিছনে উক্তি ব্যবহার না করে গান ব্যবহার করতে হবে এবং এই গানটি রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন। অঙ্কন ও স্কেচ করার দিকে আগ্রহী ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। নিজের পরিবারের অনেক সদস্যের পোর্ট্রেট তিনি আঁকেন। ছবিতে দেখা যায় তিনি লালনের পোর্ট্রেট আঁকছেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নিয়ে অনেক কাহিনী আছে। কোনো এক সময়ে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাবে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের চেয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে বরঞ্চ লালনের ভাল সম্পর্ক ছিলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের সাথে কথা বলে তাঁর ২৯৮ টি গান সংগ্রহ করেছিলেন। তাই আমার কাছে মনে হয়েছে, লালনের সাথে জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে না দেখিয়ে রবীন্দ্রনাথকে দেখালেই যুক্তিসঙ্গত হতো।

এরপরেই আমরা দেখি, লালন ফ্লাসব্যাকে চলে গেছেন। ফ্লাসব্যাকে দেখা যায়, কিশোর লালন কবিরাজকে গান শোনাচ্ছে, “আর আমারে মারিস নে মা, ননী চুরি আর করবো না”। আমি জানি না, লালনের জলবসন্ত হওয়ার আগে এই গান রচিত হয়েছিলো কী না। তাছাড়া তখন লালনের গান সংগ্রহ করার মতো তেমন কেউ ছিলো না। আর বাউল হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভের পরই।

এখানে একটা ব্যাপারে আমি একটু বলে নেই, যেহেতু পেশাগত কাজের সাথে জড়িত। ছবিতে যখন লালনের জ্বর হয়েছে, বলা হয়েছে কম্বল দিয়ে শরীর ঢাকতে। আধুনিক চিকিৎসায় এখন বলা হয়ে থাকে, জ্বর হলে শরীর থেকে সব কাপড় সরিয়ে ফেলতে। আর মৃত মনে করে ভেলায় ভাসিয়ে দেবার পর, বেঁচে থাকা বা বেঁচে উঠাকে আমার কাছে মনে হচ্ছে trans death-এর মতো। ট্রান্স ডেথ মানে হচ্ছে সোজা কথায় মৃত্যুর মতো মনে হবে, কিন্তু মারা যায় নি। ভাওয়াল রাজপরিবারের সন্যাসীর কাহিনীর সাথে এই ট্রান্স ডেথের খুব গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে। আরেকদিন এটা নিয়ে আলোচনা করা যাবে। trans death-এর ব্যাপারটা মাথায় থাকে বলেই ডাক্তাররা সবসময় কোনো রোগী মারা গেলে, মারা যাবার প্রায় ৩০ মিনিট পর মৃত্যুর ঘোষনা দেয়।

ছবিটির এই পর্যায়ে এসে আমি আবার হোঁচট খাই। দেখানো হয়েছে নদী থেকে রাবেয়া নামে এক মুসলমান মহিলা তাঁকে উদ্ধার করেন। অথচ লালন নিজেই বলেছেন, বসন্ত রোগের পর যে মহিলার সেবায় তিনি সুস্থ হয়েছিলেন, যাকে ‘মা’ বলে ডাকতেন, তার নাম মতিজান। মতিজান লালনকে নদীর পাড়ে প্রথম খুঁজে পেয়েছিলেন এই তথ্যও কোথাও নেই। এখানেও লালন নিজেই গানে বলেছেন,

“আমি লালন এক শিরে
ভাই বন্ধু নাই আমার জোড়ে
ভুগেছিলাম পকসো জ্বরে
মলম শাহ করেন উদ্ধার।”

মলম শাহ হচ্ছেন মতিজান এর স্বামী। মলম শাহ এবং মতিজান পরবর্তী জীবনে লালনের প্রতি অপরিসীম ভক্তি ও অনুরাগে অনুপ্রাণিত হয়ে লালনের ভাবধারায় মিশে গিয়ে হয়ে যান ফকির মলম শাহ এবং মতিজান ফকিরানী। ছেউড়িয়ায় লালনের সমাধি পাশেই রযেছে মতিজান ফকিরানী এবং মলম শাহের সমাধি। লালন, মতিজান ফকিরানী আর মলম শাহ আমৃত্যু ছেউরিয়াতে একসাথে ছিলেন। অথচ মনের মানুষে সিরাজ সাঁই লালনকে রাবেয়া আর স্বামীর ঘর থেকে বের করে নিয়ে যায় আর কখনও লালনের জীবনে সেই মুসলমান বাবা মায়ের উপস্থিতি দেখানো হয় না।

এখানে আরেকটি জিনিস আমার কাছে ঠিকমতো বোধগম্য হয়নি। রাবেয়ার স্বামী রাবেয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলো, “আমাদের জাতের না, বুঝলি কি করে?” রাবেয়ার উত্তর ছিলো, “আমি ওর কাপড় বদলাইছি না!” খৎনা না করানো থাকলেই কী সে মুসলমান হতে পারবে না? বা অমুসলিম কেউ কী খৎনা করায় না?

এরপরেই লালনের সাথে আবার দেখা হয় তাঁর গুরু সিরাজ সাঁইয়ের। সিরাজ সাঁই জাতিতে মুসলমান এবং পেশায় পাল্কী বাহক বেহারা সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন। নিরক্ষর লালনকে তিনি লেখাপড়া শেখাবার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলছিলেন, “এই দুনিয়ায় দুইটাই জাত, পুরুষ আর নারী, বাকী সব মানুষের অনাসৃষ্টি”। তিনি গান গেয়েছেন,

“জলের উপর পানি,
না পানির উপর জল,
আলীর উপর কালী,
না কালীর উপর আলী,
বল খোদা বল, বল খোদা বল”।

লালন শাহের স্মৃতিশক্তি ফিরে এলে লালনকে একটা চমৎকার কথা বলেন, “সময় বুঝে নিজেরে গোপন করা লাগে, আবার সময় বুঝে নিজেরে প্রকাশ করা লাগে”। কথাগুলো শুনতে ভালোই লেগেছে। সিরাজ সাঁইয়ের প্রতি মনটা শ্রদ্ধায় ভরে উঠে। কিন্তু যখন নিজের বাড়ি থেকে আসার পর লালনকে সাধন-সঙ্গী্র প্রয়োজন বলে ময়ূরী নামে কামুক নারীর কাছে পাঠায়, আর বলে, “নারীর অন্তরে ইর্ষা, চক্ষে কামনা” বা “নারীই হলো আনন্দ সহচরী, মহামায়া, তিনি সৃষ্টি আর স্থিতির জননী, আবার লয়-বিলয়ের মহা শক্তি”, তখন তাকে সামান্য একজন দালালের মতোই লাগে, কিন্তু আমি জানি সিরাজ সাঁইয়ের চরিত্র এরকম ছিলো না, তাহলে কেনো তা দেখানো হলো? খুব কী প্রয়োজন ছিলো সেই মেয়েটির মুখ দিয়ে “পারবে অমাবশ্যায় পূণির্মা জাগাতে?” বলানো এবং তারপরে লালনের সাড়া দেবার দৃশ্যটিকে দেখানো?

লালন নিজের বাড়িতে গিয়ে নিজের পরিচয় দেবার পর যখন লালনের মা বলে, “জাত গেছে, যবনের হাতে অন্ন খেয়েছিস”, এবং তারপর লালনের ধর্ম নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি্র পরিবর্তন দেখে মনে হয়েছে, যে ব্যক্তিটি আজীবন নিজের ধর্ম পরিচয়টিকে লুকিয়ে রাখলেন, তাঁর জন্য এই একটিমাত্র ঘটনাই কী টনিক হিসেবে কাজ করলো? আমার কেনো জানি মনে হলো এখানে লালনকে ছোট করা হয়ে গেলো।

ছবিতে এরপরে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে। কালুয়া এবং কলমি। একজন মহান ব্যাক্তিকে নিয়ে বায়োগ্রাফিক্যাল মুভিতে এই দুইটি কাল্পনিক চরিত্রের কী আদৌ প্রয়োজন ছিলো? যেখানে দেখানো হয়েছে, অন্ধকার ঘরে লালন একলা বসে আছেন। কলমি এসে লালনের সাথে কথা বলার অনুমতি নিয়ে হঠাৎ করে লালনের কাঁধে মুখ ঘষতে থাকে, বলতে থাকে “আমার জ্বালা মিটিয়ে দেও গো সাঁই”, এরপর কলমির হাত এবং মুখ লালনের গা বেয়ে নিচে নামতে থাকে। আস্তে আস্তে এত নিচে নেমে যায় যে আর দেখা যায় না। লালন নিজেকে সংবরণ করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে কলমির খিলখিল হাসি শোনা যায়। কলমি বলে উঠে, “এইতো তোমার শরীর জেগে উঠেছে। আমাকে শান্ত করো সাঁই। তুমি দেখছি ভাবের ঘরে চুরি করো সাই”। লালন স্থির গলায় বলে উঠে, “শরীর জাগে শরীরের নিয়মে, মন যদি না জাগে?” কলমি চলে যায়। আবার একজায়গায় দেখানো হয়, কলমি ঘরের চালে ঘর বাধার কাজে ব্যস্ত কালুয়ার দিকে ইঙ্গিত মূলক দৃষ্টি নিক্ষেপ করার পর কালুয়া চাল থেকে নেমে পাগলের মতো ছোটাছুটি করতে থাকে। নিজের হাতে বানানো ঘর নিজেই দা দিয়ে কোপাতে থাকে। সব দেখে শুনে লালন কলমিকে বলে, “কালুয়ার নারী সঙ্গ লাগে, আমি চাই তুমি ওর সেবা করো”। কলমি বলে, “সময় গেলে সাধন হবে না”। শেষে যেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও লালনের নিদের্শে পালন করতে রাজী হয়ে যায় কলমি। আমি জানি না, কাল্পনিক চরিত্র দিয়ে এগুলো দেখানোর উদ্দেশ্য কী? কলমির চেয়ে লালন ফকিরের সহধর্মিনী এবং সাধনসঙ্গী বিশখা ফকিরানীকে দেখানো হলে কী খুব অসুবিধা হতো? বিশখা ফকিরানী সারাজীবন লালনের সাথে ছিলেন। মৃত্যুর পর তার কবর লালনের কবরের সাথেই দেওয়া হয়েছে। সেই বিশখা ফকিরানীকে কেনো আমরা ছবিতে দেখতে পেলাম না?

‘মনের মানুষে’ আরো দুইটি নারী চরিত্র দেখনো হয়েছে। একজনকে দেখা যায়, বিধবা হওয়ায় যাকে 'সতীদাহ' প্রথায় জীবন্ত পোড়ানো হচ্ছিলো। সেই নারীকে লালন ও তাঁর শিষ্যরা রক্ষা করে এবং 'আনন্দবাজারে' ঠাঁই দেয়। সেই নারী মানে ভানুমতিকে কলমি লালনের কাছে পাঠায় 'সেবা' করার জন্য এবং লালন আবার সাধনসঙ্গিনী করে দেন তাঁরই শিষ্য দুন্দু শাহ-এর। এক জায়গায় এই দুন্দু শাহের প্রশ্ন ইসলামে গান হারাম কী না, এর জবাবে “আকাশটা কাপছিল ক্যান ? জমিনটা নাচছিল ক্যান? বড়পীর ঘামছিল ক্যান, সেই দিন সেই দিন, গান গাইছিল খাজা যেই দিন” গানটি গেয়ে কী বোঝাতে চাইলো বুঝতে পারলাম না। আমি সঠিক জানি না, কোথায় যেনো পড়েছি, এই গানটি লালনের নয়, মাত্র ২০/২৫ বছর আগের লেখা! আরেকজন নারী চরিত্র হচ্ছেন সর্বক্ষেপী বোষ্টমী, যার নাম ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু ব্রাহ্মণের দ্বারা এই নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলো কী না, তা কোথাও খুঁজে পাই নি।

ছবিটির এই পর্যায়ে তিনটি ঐতিহাসিক চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে। মনিরুদ্দিন শাহ, কাঙ্গাল হরিনাথ এবং মীর মশাররফ হোসেন। লালন জীবনে মনিরুদ্দিন শাহ খুবই গুরুত্বপূর্ন। লালন যখনই কোনো গান বাঁধতেন, মনিরুদ্দিন শাহকে ডাকতেন এবং গেয়ে শোনাতেন। মনিরুদ্দিন শাহ সেই গান শুনে লিখে রাখতেন। এখন পর্যন্ত লালনের যে সমস্ত গান পাওয়া গেছে তার বেশীর ভাগ কৃতিত্ব মনিরুদ্দিন শাহের। মাঝে মাঝে এই একই কাজ করতেন ফকির মানিক। কিন্তু ছবিতে ফকির মানিকের উপস্থিতি একেবারেই নেই আর মনিরুদ্দিন শাহকে রাখা হয়েছে অন্যান্যের মতো একজন সাধারণ বাউল বেশে। কেনো এটা করা হয়েছে, আমার ছোট মাথায় তা ধরেনি।

ছবিতে অসম্পূর্ণ দুই চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে কাঙ্গাল হরিনাথ আর মীর মশাররফ হোসেনকে। কাঙাল হরিনাথের জন্ম কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালিতে। তার আসল নাম হরিনাথ মজুমদার। ১৮৬০ সালের এপ্রিলে কাঙ্গাল হরিনাথ গ্রামবার্তা প্রকাশিকা নামক একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। পত্রিকায় সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ, ছড়া ইত্যাদি প্রকাশিত হতো। এই পত্রিকার মাধ্যমে তিনি গ্রামবাংলার অত্যাচারিত কৃষক সমাজের দুঃখ দুর্দশার কথা বৃহত্তর জনসমাজে প্রচার করেন। গ্রামবার্তা পত্রিকায় হরিনাথ জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনী প্রকাশের অপরাধে জমিদারেরা তাঁর ওপর হামলার পরিকল্পনা করেন। পত্রিকা অফিসে আক্রমন করার খবর ছেঁউড়িয়াতে পৌঁছলে লালন তার অনুসারীদের নিয়ে হরিনাথের বাড়ি পাহারা দেন। হরিনাথ মজুমদার একটি বাউলের দল করেছিলেন। তিনি গানও লিখতেন। লালনের সঙ্গে হরিনাথের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা ছিল। কাঙ্গাল হরিনাথের প্রেসে বসে লালন “এ যে দেখি কানার হাট-বাজার” গানটি রচনা করেন। অন্যদিকে কাঙ্গাল হরিনাথের অনেক গান বর্তমানে প্রচলিত থাকলেও তার নাম কাউকে উল্লেখ করতে দেখা যায় না। সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ছবি পথের পাঁচালীতে কাঙ্গাল হরিনাথের “হরি দিনতো গেল-সন্ধ্যা হল-পার কর আমারে” গানটি ইন্দির ঠাকুরনের ভূমিকায় চূনীবালা গেয়েছিলেন। কিন্তু রচয়িতা হিসাবে হরিনাথের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

বিষাদ সিন্ধু ও জমিদার দর্পণ-এর রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন, প্রখ্যাত সাহিত্যিক-সাংবাদিক জলধর সেন, অক্ষয় কুমার মৈত্র, দীনেন্দ্র কুমার রায়রা ছিলেন কাঙ্গাল হরিনাথের শিষ্যতুল্য এবং গ্রামবার্তার লেখক। মীর মশাররফ হোসেন ছিলেন হরিনাথের বন্ধু ও গ্রামবার্তার সংবাদদাতা। কাঙ্গাল হরিনাথের কাছ থেকে মীর মশাররফ হোসেন গদ্য লেখা শিখে বিষাদ সিন্ধু রচনা করেন। এর সম্পাদনায় ছিলেন কাঙ্গাল হরিনাথ নিজে। লালনের মৃত্যুর ১২ দিন পর তৎকালীন পাক্ষিক পত্রিকা মীর মশাররফ হোসেন সম্পাদিত ‘হিতকরী’-তে প্রকাশিত একটি রচনায় সর্বপ্রথম তাঁকে "মহাত্মা" হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। রচনার লেখকের নাম ছিলো রাইচরণ।

পুরোহিত আর মৌলভীদের একটা অংশে আমি খুব মজা পেয়েছি। যখন তারা একটা বাঁশের সাঁকোতে দাঁড়িয়ে লালনের বিরুদ্ধে শলা-পরামর্শ করছিলো, পুরোহিত বার বার বলছে, “ছায়া যাতে না পড়ে। এখন গঙ্গাজল পাই কোথায়?” পরে বাহাসের সময় মারামারির একপর্যায়ে দেখা গেছে পুরোহিত আর মৌলভীকে হাত ধরাধরি করে পুকুর পাড়ে যেতে।

ছবিতে দেখানো হয়েছে লালন ‘আনন্দবাজার’ নামে এক জায়গায় আস্তানা গেড়েছে। অথচ ইতিহাস বলে লালনের আখড়া ছিলো ছেউরিয়ায়। দেখানো হয়েছে, সিরাজ সাঁই শিষ্যসহ গঞ্জিকা সেবন করছে, এর মাজেযা বুঝতে পারলাম না। দেখানো হয়েছে, কাঙ্গাল হরিনাথের পরামর্শে লালন হাতে লাঠি তুলে নেয়, অথচ তাদের জীবিকা নির্ধারনের কোনো রাস্তা দেখানো হয়নি। আমি যতদূর জানি, লালনের শিষ্যরা পানের বরাজসহ বিভিন্ন কৃষিকাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। দেখানো হয়েছে, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লালনের আনন্দবাজারের খাজনা মওকুফ করে দেন, অথচ দেখানো হয় নি কীভাবে ঠাকুর বাড়ির জমিদারদের সাথে লালনের পরিচয় হলো।

ছবিটির নাম ‘মনের মানুষ’। বাউল ও লালন বিষয়ক পণ্ডিত অধ্যাপক উপেন্দ্রকিশোর ভট্টাচার্য বাউলদের 'মনের মানুষ' সম্পর্কে বলেনঃ

"মানব-দেহস্থিত পরমতত্ত্ব বা আত্মাকে বাউল 'মনের মানুষ' বলিয়া অভিহিত করিয়াছে। আত্মাকে 'মানুষ' বলার তাৎপর্য মনে হয় এই যে, আত্মা মানবদেহকে অবলম্বন করিয়া বাস করিতেছেন ও মানবদেহের সাধনার দ্বারাই তিনি লভ্য এবং এই মানবাকৃতি তাঁহারই রূপ মনে করিয়া বাউল তাঁহাকে 'মানুষ' বলিয়া অভিহিত করিয়াছে। এই মানুষ অলক্ষ্য অবস্থায় হূদয়ে বা মনে অবস্থান করিতেছেন, বোধহয় এই কল্পনা করিয়া তাহারা তাঁহাকে 'মনের মানুষ' বলিয়াছে। এই আত্মাকে তাহারা 'মানুষ', 'মনের মানুষ', 'সহজ মানুষ', 'অধর মানুষ', 'রসের মানুষ', 'ভাবের মানুষ', 'আলেখ মানুষ', 'সোনার মানুষ', 'সাঁই' প্রভৃতি নানা নামে অভিহিত করিয়াছে।"

এ প্রসঙ্গে লালন যা বলেন,

"এই মানুষে আছে, রে মন,
যারে বলে মানুষ রতন, লালন বলে পেয়ে সে ধন
পারলাম না রে চিনিতে।।"

মজার ব্যাপার হচ্ছে, গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্র 'মনের মানুষ'-এ আমি এরকম কোনো মনের মানুষের সংজ্ঞাই পেলাম না, যা পেয়েছি তা হচ্ছে ঝাপসা এবং অসম্পূর্ণ।

ছবিটি দেখতে আমার খুব ভালো লেগেছে। এর দৃশ্যায়ন, ক্যামেরার কাজ, যদিও এগুলো সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না, মুগ্ধ হয়ে দেখেছি। যে প্রাকৃ্তিক পরিবেশে শুটিং হয়েছে, মনে হয়েছে সেখানে হারিয়ে যাই। যুবক লালন হিসেবে জিশানের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছি, মনে হয়েছি সত্যি সত্যি যুবক লালনকে দেখছি। সিরাজ সাঁইয়ের চরিত্রে রাইসুল ইসলাম আসাদ, পদ্মাবতী হিসেবে গুলশান আরা চম্পা, কালুয়া চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী, কবিরাজ হিসেবে হাসান ইমাম-প্রত্যেকের অভিনয় দেখে বাংলাদেশি হিসেবে গর্ববোধ করেছি। আবার কলমি চরিত্রে পাওলি দামের অভিনয় দেখে মনেই হয় নি এটা তার প্রথম কোনো চলচ্চিত্রে অভিনয়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর হিসেবে প্রিয়াংশু চ্যাটার্জীকে ভালোই মানিয়ে গিয়েছে। আর পূর্ণবয়স্ক লালন চরিত্রে প্রসেনজিতের কথা বলার কিছুই নেই, যতই দিন যাচ্ছে এই প্রতিভাবান এবং জনপ্রিয় অভিনেতার অভিনয়গুণ যেনো আরো প্রস্ফুটিত হচ্ছে।

মনের মানুষে প্রচুর গান ব্যাবহার করা হয়েছে, সে অর্থে এটা একটি মিউজিক্যাল মুভিও বটে। এই ছবিটি দেখতে গিয়ে আমার বাংলাদেশের আরেকটি ছবি, প্রখ্যাত নাট্যকার মমতাজ উদ্দিনের পরিচালনায় ‘হাছন রাজা’র কথা মনে গেলো। দুইটি ছবিই প্রায় একই ধাঁচের, যদিও মেকিং-এ বিস্তর পার্থক্য আছে। আরেকটি কথা না বললেই নয়, সর্বক্ষেপী বোষ্টমী চরিত্রে বিবি রাসেলের অভিনয় সপ্রতিভ না হলেও, তার চরিত্রগুলোর পোশাক ডিজাইন আমার কাছে ভালোই লেগেছে।

আসলে, মনের মানুষকে যদি আমি শুধুমাত্র চলচ্চিত্র হিসেবে দেখি, তাহলে আমার দেখা অসাধারণ এক চলচ্চিত্র, যে চলচ্চিত্র মন কে অনেকক্ষন ধরে আবেশ করে রাখে। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে তখন মনের মানুষকে কাঠগড়াতে দাঁড়াতেই হবে।

সবশেষে একটি মজার তথ্য দিয়ে এই লেখা শেষ করতে চাচ্ছি। ছবিটির একদম শেষে দেখা যায়, গগন হরকরা নামে এক যুবক লালনকে “আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে”-গানটি শুনাচ্ছে। গগন হরকরা ছিলেন বিশিষ্ট বাউল গীতিকার। জন্ম হয়েছিলো শিলাইদহের নিকটস্থ আড়পাড়া গ্রামে। পেশা ছিল শিলাইদহ ডাকঘরে চিঠি বিলি করা। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গুণমুগ্ধ ছিলেন। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত “আমার সোনার বাংলা” গানটি রবীন্দ্রনাথ গগন হরকরার গাওয়া এই গানটিরই সুর ভেঙে রচনা করেন। সরলা দেবী চৌধুরাণী তাঁর ‘শতগান’ গ্রন্থে উভয় গানের স্বরলিপিই প্রকাশ করেন।

“আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে –
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে।
লাগি সেই হৃদয়শশী সদা প্রাণ হয় উদাসী
পেলে মন হত খুশি দেখতাম নয়ন ভরে।
আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে নিভাই অনল কেমন করে
মরি হায় হায় রে
ও তার বিচ্ছেদে প্রাণ কেমন করে
ওরে দেখ না তোরা হৃদয় চিরে।
দিব তার তুলনা কি যার প্রেমে জগৎ সুখী
হেরিলে জুড়ায় আঁখি সামান্যে কি দেখিতে পারে
তারে যে দেখেছে সেই মজেছে ছাই দিয়ে সংসারে।
মরি হায় হায় রে –
ও সে না জানি কি কুহক জানে
অলক্ষ্যে মন চুরি করে।
কুল মান সব গেল রে তবু না পেলাম তারে
প্রেমের লেশ নাই অন্তরে –
তাইতে মোরে দেয় না দেখা সে রে।
ও তার বসত কোথায় না জেনে তায় গগন ভেবে মরে
মরি হায় হায় রে –
ও সে মানুষের উদ্দেশ যদি জানিস কৃপা করে
আমার সুহৃদ হয়ে ব্যথায় ব্যথিত হয়ে
আমায় বলে দে রে”।

বেশরা ফকির লালন সাঁইকে নিয়ে ভদ্দরলোকদের সূক্ষ্ম প্রেমের মর্ম বোঝা ভার!!

১

গৌতম ঘোষের মনের মানুষ (২০১০) সিনেমা নিয়ে আলাপ তুলবার আগে এর শানে নুযুল একটু বিশদ করা প্রয়োজন। সিনেমাটি তৈরি হয়েছে কলকাতার যশবান কবি-ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মনের মানুষ উপন্যাস অবলম্বনে। উপন্যাসটির ভিতর ফ্ল্যাপে কাহিনী-সংক্ষেপ ছাপা হয়েছে এভাবে:

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘মনের মানুষ’-এর প্রধান চরিত্র লালন ফকির। কবিরাজ কৃষ্ণপ্রসন্ন সেনের ঘোড়া চুরি করে রাতে মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াতে ভাল লাগত লালুর। দুঃখিনী মা তাকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েও সংসারী করতে পারেননি। রুজি-রোজগারে লালুর মন নেই, বরং গানের ব্যাপারে তার কিছু আগ্রহ আছে। বাউন্ডুলে স্বভাবের লালুর জীবনে বিপর্যয় এল হঠাৎ। কবিরাজ পরিবারের সঙ্গে বহরমপুরে গঙ্গাস্নানে গিয়েছিল সে। পথে আক্রান্ত হয় ভয়ঙ্কর বসন্ত রোগে। তাকে মৃত ভেবে জলে ভাসিয়ে দেয় সঙ্গীরা। মরেনি লালু। রাবেয়ার পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে সে একদিন ঘরেও ফেরে। কিন্তু মুসলিম-সংস্পর্শে তার যে জাত গেছে! তাকে মেনে নেয় না তার মা, বউ। অগত্যা সমাজ থেকে বিতাড়িত যুবকের নতুন জীবন শুরু হয় জঙ্গলে। নতুন নাম হয় লালন। অভিজ্ঞতা আর বেদনা লালনের অন্তরে জন্ম দেয় শত শত গান, যে গান বলে- ‘ছুন্নত দিলে হয় মুসলমান/নারী লোকের কী হয় বিধান/বামন চিনি পৈতে প্রমাণ/বামনী চিনি কীসে রে…’। লালন বাঙালির প্রাণের ধন, পথে পথে যিনি আজীবন খুঁজেছেন ‘মানুষ-রতন’। [নজরটান আমার]

মনের মানুষ সিনেমার পোস্টার

লেখকের বক্তব্যে সুনীল বলে দিয়েছেন: ‘‘এই উপন্যাসটি লালন ফকিরের প্রকৃত ঐতিহাসিক তথ্যভিত্তিক জীবনকাহিনি হিসেবে একেবারেই গণ্য করা যাবে না। কারণ তাঁর জীবনের ইতিহাস ও তথ্য খুব সামান্যই পাওয়া যায়।’’[২] তাই আমরা ধরে নিতে পারি যে লালনের নামে প্রচলিত নানা কাহিনীর মতো এটাও যে-কোনো একটা কাহিনী; এবং ঐতিহাসিক তথ্যর ‘সত্যতা’ কোন মানদণ্ডে নির্ধারিত হয় তার ফয়সালা আপাতত তুলে রাখতে পারি। যদিও, পরের বাক্যে তিনি একটা দোহাই পেরেছেন যে এর কারণ হলো: ‘‘লালনের জীবনের ইতিহাস ও তথ্য খুব সামান্যই পাওয়া যায়’’। আমরা যে কেউ একটু খোঁজ নিলেই জানতে পারবো, পুরো বাংলায় ‘গৌণধর্ম’গুলোর ভিতরে সাম্প্রতিক একশ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও চর্চিত চরিত্র হলো ফকির লালন সাঁই। সুতরাং, চাইলে লালনের সাধকজীবনের ‘ঐতিহাসিক’ একটা কাহিনী লেখাও অসম্ভব হতো না। ইতিহাসকে উর্ধ্বকমার ভিতরে বন্দি করেছি কারণ, ইতিহাস বলে কোনো সায়েন্টিফিক সত্য নাই। ইতিহাসের লেখকও একটা সময়ের নির্মাণ। তার হাত দিয়ে যে ইতিহাস লিখিত হয় তা পরিস্থিতি বা ঘটনা/ঘটনাবলীর একটামাত্র ভাষ্য—একটা কাহিনী। যাহোক, সুনীলের বক্তব্য এটুকু অন্তত নিশ্চিত করছে যে, তিনি নির্ভরযোগ্য ও যাচাইকৃত ঐতিহাসিক তথ্যনির্ভর উপন্যাস না লিখে একটা কাহিনী ফেঁদেছেন। তাই, ঐতিহাসিক ‘সত্যতা’ কতোটুকু এই উপন্যাসে আছে তা নয়, এবং এ কাহিনী ইতিহাসনির্ভর হোক বা না হোক, এ সময়ে লালন জীবনের এই কাহিনী কী তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয় তা আমাদের প্রধান বিচার্য বিষয় হয়ে ওঠে।

সুনীল আরেকটা বিবৃতি দিয়েছেন লেখকের কথায়: ‘‘লালন ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু কোনোও বিশেষ ধর্মের রীতিনীতি পালনে আগ্রহী ছিলেন না। সব ধর্মের বন্ধন ছিন্ন করে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন জীবনে।’’[৩] ‘ধার্মিক’ ও ‘মানবতা’ শব্দ দিয়ে তিনি আধুনিক মানবতাবাদের ‘ভাবকল্প’ লালনের কাঁধে তুলে দেন। কিন্তু এর ভিত্তিই বা কী! বস্ত্তত সব কাহিনীতেই কাহিনীকারের ‘আমি’ থাকে। ফলে লেখক নিজস্ব চরিত মানবতাবাদের চাদরেই মুড়ে নেন লালনকে। তার ‘আধুনিক’ ‘মানবতাবাদী’ মনের চোখে লালনের ইমেজ দাঁড়ায় এরকম: বসন্ত-আক্রান্ত পরিত্যাক্ত লালু মুসলমান নারীর হাতে অন্ন গ্রহণের কারণে হিন্দু-সমাজ পরিত্যক্ত হয়। তাকে মেনে নেয় না তার মা, বউ। অগত্যা সমাজ থেকে বিতাড়িত যুবকের নতুন জীবন শুরু হয় জঙ্গলে। নতুন নাম হয় লালন। অভিজ্ঞতা আর বেদনা লালনের অন্তরে জন্ম দেয় শত শত গান, যে গান বলে- ‘ছুন্নত দিলে হয় মুসলমান/নারী লোকের কী হয় বিধান/বামন চিনি পৈতে প্রমাণ/বামনী চিনি কীসে রে…’। এ যেন জাত যাওয়ার একটা কাহিনীর ‘কেশের আড়ে’ শৈব-সহজিয়া-বৈষ্ণব-সুফি ধারার সম্মিলনে গড়ে ওঠা উজ্জ্বলতম এক পন্থার দিশারী দরবেশ ফকির লালনের পুরো সাধকজীবনের ‘পাহাড় লুকায়’। আর এই লুকোচুরিতেই লালন হয়ে ওঠেন বাঙালির প্রাণের ধন, পথে পথে যিনি আজীবন খুঁজেছেন ‘মানুষ-রতন’।

কিন্তু ধন্ধ লাগে উপন্যাসটির পেছন মলাটে তাকালে। কৃষক চৈতন্য ও নিম্নবর্গের স্বরের ইতিহাস রচনা করে এবং সাবলটার্ন স্টাডিজ নামে ভারতীয় ইতিহাস অধ্যয়নের এক নতুন ধারার প্রবর্তনা করে জগত-বিখ্যাত হয়েছেন পণ্ডিত রণজিৎ গুহ। প্রচলিত ইতিহাস রচনার খোলনলচে বদলে দিয়েছে তাঁর ভাবনাগুলো। ইতিহাস পাঠে নতুন নজরদৃষ্টি দানের জন্য তাঁর কাছে আমাদের ঋণ অসীম। তাঁর একটা ছোট্ট মূল্যায়ন ছাপা হয়েছে মনের মানুষ[৪] উপন্যাসের পেছন-মলাটে। তিনি বলছেন ‘‘তথ্যগত ভিত্তি সংকীর্ণ হলেও একটা ঐতিহাসিক কাহিনীর ঐতিহাসিকতা কী করে বজায় রাখা যায় সেই দুঃসাহসিক চেষ্টার সাফল্য এ উপন্যাসে সত্যিই বিস্ময়কর।’’ লালনকে নিয়ে ‘ইতিহাসরূপ’ কল্পকাহিনী কতোদূর বিস্তৃত হয়েছে তা এই মন্তব্য থেকেই অনুমান করা যায়। লেখক যদিও বলেছেন এটাকে লালনের ‘প্রকৃত ঐতিহাসিক তথ্যভিত্তিক জীবনকাহিনি হিসেবে একেবারেই গণ্য করা যাবে না’, তার বিপরীত কথা বলেন রণজিৎ গুহ। তাহলে প্রশ্ন জাগে, উপন্যাসবর্ণিত কাহিনীর ঐতিহাসিকতার প্রমাণপত্র কেন ছাপা হলো, লেখকের বক্তব্যর সাথে এর সাযুয্য কোথায়? গুহর কথাগুলোকেও তো আমরা ফেলে দিতে পারি না! আমরা সুনীলের উপন্যাসটিকে কীভাবে পাঠ করবো তাহলে: শুধুই একটা কাহিনী, নাকি ইতিহাস? নাকি, নির্মিয়মান ইতিহাসের উপাদান হিসেবে গড়ে তোলা কাহিনী! সুনীলের লেখা কল্পকাহিনীটি ‘ইতিহাস’ রূপে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্যই কি গুহর সার্টিফিকেট ছাপা হয়েছে? উপন্যাসটির শেষ পৃষ্ঠায় রণজিৎ গুহর উদ্ধৃতিটুকু পড়ে এই প্রতীতিই দৃঢ় হয় যে বাংলার আগামী ইতিহাস নির্মাণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই কাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে। লালন হবেন একটা ‘আইকন’- যার ধর্ম হলো ‘মানবতাবাদ’।

আর, এই প্রকার মানবতাবাদের টানেই গৌতম ঘোষ বানিয়েছেন ‘মনের মানুষ’ সিনেমাটি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে। বাঙালি জাতির ইতিহাস গঠনের প্রশ্নে এই চলচ্চিত্রটি পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। জরুরি কেননা, ০৩-১২-২০১০ তারিখে দুই বাংলায় একইসাথে ১০০টি পেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় মনের মানুষ চলচ্চিত্রটি। যতোদূর জানা যায়, এর আগে যৌথ প্রযোজনায় বাংলাদেশে আরো অনেক চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও কখনোই কোনো চলচ্চিত্র একসঙ্গে দুই দেশে মুক্তি পায়নি।[৫] আর, মুক্তি পাওয়ার আগেই ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত ৪১তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘গোল্ডেন পিকক’ পায়। গত দশ বছরের মধ্যে আর কোনো ভারতীয় চলচ্চিত্র এ পুরস্কার পায়নি। ‘‘বিস্ময়কর চালিচ্চিত্রিক সৌন্দর্য এবং ঘৃণা-ক্লেদে পূর্ণ আজকের পৃথিবীতে ভালোবাসার আন্তরিক চিত্রায়ণের জন্য’’[৬] মনের মানুষকে এই পুরস্কার দেয়া হয়। ছবি মুক্তির দু’দিন পরে ঢাকায় ছবিটি নিয়ে প্রচারণায় এসে গৌতম ঘোষ সংবাদ সম্মেলনে ‘মনে করিয়ে’ দেন যে ‘মনের মানুষ লালন বিষয়ক চলচ্চিত্র, লালন জীবনী বিষয়ক নয়। আর লালন মানে একটি দর্শন যা সহনশীলতার শিক্ষা দেয়।’’[৭] ২৩ ডিসেম্বর ২০১০ বিবিসি বাংলা সার্ভিসের সাথে সাক্ষাৎকারে[৮] এই ছবি নির্মাণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিগত শতাব্দীর নব্বই দশক থেকেই এই সিনেমা বানাবার পরিকল্পনা ছিল তার। ‘‘নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যখন বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা হলো তখনই আমার মনে হয়েছে একটা ছবি বানাবো লালনকে নিয়ে। কারণ বিশ্বজুড়ে ধর্মীয়, রাজনৈতিক যে অসহিষ্ণুতা তৈরি হচ্ছে তার বিপক্ষে দাঁড়ানোর শক্তি কেবল লালনেরই আছে।’’

বুঝা যাচ্ছে, মনের মানুষ এ সময়ের একটা তাৎপর্যপূর্ণ সিনেমা। এ সিনেমা ক্লেদপুর্ণ দুনিয়ায় ধর্মীয় সহিষ্ণুতার শিক্ষা দেবে, হিন্দু মুসলমানের ঐক্যেরও পথ করে দেবে। একইসাথে, এ সিনেমা দুই বাংলার রক্তাক্ত ইতিহাস পুনর্লিখনেও নিযুক্ত। যে-কারণে লোকরঞ্জন সংস্কৃতির মুখপাত্ররা এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ওপারের বাংলাবাজার পত্রিকায় সমরেশ মজুমদার তার প্রতিক্রিয়া লিখেছেন ‘‘মনের মানুষ: তবু যা পাওয়া গেল চুমুক দিয়ে খাবার পরেও আলোড়িত থাকার মতো’’ শিরোনামে[৯]। তিনি এতোই আলোড়িত হয়েছিলেন যে বলেন: ‘‘শুধু ছবি বললে কম বলা হবে। আমি এক মহাজীবন প্রত্যক্ষ করলাম। বাংলা ভাষার যাবতীয় বিশেষণগুলো মিইয়ে যাচ্ছে।’’ আর, এদেশের অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তাঁর সাথে সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে এসে বলেছিলেন: ‘‘আমি স্নাত’’!! আভিজাত্যবাদী ও তথাকথিত সেক্যুলারবাদীরা বাংলার এমন এক ইতিহাস কল্পনা করেন যেখানে লালনের এই নির্মাণই প্রত্যাশিত। ফলত তারা স্বভাবতই এ সিনেমা দেখে আনন্দে ডগমগ হবেন। যদিও, ফকির লালন সাঁই ও তার শিষ্যরা কেন ভদ্দরলোকদের থেকে দূরে থাকতেন সেটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও গৌতম ঘোষের মনের মানুষ পড়ে ও দেখে আন্দাজ করতে অসুবিধা হয় না। ফকিরদের অজাত-কুজাত বলে গালি দেয়া বা নিতান্ত অবহেলায় অগ্রাহ্য করাটাই চল, আর যখন তাদের ঘরে তোলা হয় তখন ধোলাইমোছাই করে নিজেদের মতাদর্শের মাপে কেটে-ছেঁটে এমন এক আকৃতি দেয়া হয় যে ফকির নিজেও তার অবয়ব চিনতে পারে না। একালের সুনীল-গৌতম লালনের এমন এক অবয়বই খাড়া করেন।

মনের মানুষ, চিত্র ১: কমলি ঠাইরেন লালনের শরীর জাগানোর চেষ্টায় রত

তবে, লালন নিয়ে যারা একটু খোঁজখবর রাখেন তারা কিন্তু কোনো মহাজীবনের ছাপ সিনেমাটিতে দেখতে পাচ্ছেন না। তাই, বাংলাদেশে, যথাযথ কারণেই, গৌতম ঘোষের মনের মানুষ নিয়ে একটা অসন্তোষ ও প্রতিবাদ দানা বেঁধে উঠেছে। লালন গবেষক, আলোচক, পর্যবেক্ষক, ভক্তরা মনের মানুষকে কীভাবে গ্রহণ করছেন এবং তাদের মূল্যায়ন কি–এ বিষয় নিয়ে বিডিনিউজ২৪ ডট কম ২৮ জানুয়ারি ২০১১ এক সেমিনারের আয়োজন করে। আর্টস সম্পাদক ব্রাত্য রাইসুর সঞ্চালনায় আলোচনা হয় এবং লাইভ ব্লগিং-এর মাধ্যমে আলোচনার চুম্বক অংশ পাঠকের সামনে তুলে ধরা হয়। যে লালনকে নির্মাণ করা হয়েছে সিনেমাটিতে তা, ফরহাদ মজহারের জবানে, এক ধরনের ‘পারভার্সন’। কেননা, ‘‘মনে হচ্ছে লালন যেন আনন্দবাজারে একটা ব্রোথেল পরিচালনা করে’’। তাই তিনি দাবি করেন, ‘‘এই ছবিতে লালনকে চরমভাবে অপমান করা হয়েছে।’’ অর্থাৎ, লালনের যে ইমেজ আমাদের মনে আসে তা একেবারেই নির্মিত হয়নি মনের মানুষ সিনেমায়, মহাজীবন তো কোন দূরের কথা। দ্বিতীয় যে অভিযোগটি স্পষ্ট করে বলেছেন আলোচকেরা, যেমন অরূপ রাহী বলেন, ‘‘এটা কালচার ইন্ডাস্ট্রির একটা প্রেডাক্ট ছাড়া আর কিছুই না।’’ সলিমুল্লাহ খান, ফাহমিদুল হক, মানস চৌধুরীসহ আরও অনেকে সহমত হন এই বক্তব্যের সাথে। মানস চৌধুরী বলেন, ‘‘এই ছবিতে মিস্টি প্রেমের গল্প আছে। ডিসলোকেশন আছে। মধ্যবিত্তীয় পছন্দের ফোক-ফ্যান্টাসি নির্ভর নানা উপকরণে সমৃদ্ধ। মোটকথা, এর ভিতরে জনপ্রিয়তার উপকরণগুলো আছে।’’ সলিমুল্লাহ খান তৃতীয় অভিযোগটা তুলেছেন: ‘‘অভিজাতের দৃষ্টিতে লালনকে দেখাই হচ্ছে এই ছবির প্রধান প্রতিপাদ্য। মনে হয়েছে রাতভর তিনি ঠাকুরকে তার কাহিনী শুনিয়েছেন খাজনা মওকুফের জন্য। সকালবেলা খাজনা মওকুফের ঘোষণা শুনে তার অভিব্যক্তি যেন সেটাই তুলে ধরে।’’ এই অভিযোগগুলোর পাশাপাশি রাহী যুক্ত করেন: ‘‘তবে এর রিপ্রেজেন্টেশনাল রাজনীতিটা বুঝতে হবে।’’ অবশ্য সেই রাজনীতিটা তিনি খোলসা করেন নি, অন্য আলোচকদেরকেও দেখি না খোলসা করতে। কল্লোল মুস্তফা ‘গৌতম ঘোষের ‘‘মনের মানুষ’’: জাতহীনের জাত মারার তরিকা’’[১০] প্রবন্ধেও বস্ত্তত এই অভিযোগগুলোই তুলেছেন। কয়েকটি দৃশ্য আলোচনা করে কল্লোল মন্তব্য করেছেন: ছবিটিতে নারী পুরুষের সম্পর্ককে ‘ভাব জেনে প্রেম করা’, ‘কামী থেকে নিষ্কামী হয়ে উঠা’ কিংবা ‘কামের ঘরে কপাট মারা’র সাধনার অংশ হিসেবে দেখি না, দেখি কামোন্মত্ত নারী-পুরুষের কাম নিবৃত্ত করার উপায় হিসেবে, লালন কিংবা সিরাজ সাঁইয়ের ভূমিকা যেখানে গুরুর নয়, দালালের।’’ দ্বিতীয় যে আপত্তির জায়গা কল্লোল শনাক্ত করেছেন তা হলো: ভদ্রলোক পরিচালক গৌতম ঘোষ লালন ও তার সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষের যৌনতা বিষয়ে যতটুকু আগ্রহ দেখিয়েছেন তার এক শতাংশ আগ্রহও দেখাননি তার সামাজিক ও যৌথ জীবনের অন্যান্য অনুষঙ্গে। আবার যতটুকু এনেছেন, সেটাকে এনেছেন ছাড়া ছাড়া ভাবে খণ্ডিত, খর্বিত, সরলীকৃত ও বিকৃত রূপে।’’ তার তৃতীয় অভিযোগটি এরকম: ‘‘গোটা ছবিতে দেখা যায় লালন সম্প্রদায়ের প্রধান শত্রু হলো মোল্লা আর পুরুত মশাইরা আর প্রধান পৃষ্ঠপোষক হলো জমিদার। অথচ মোল্লা পুরুতের পাশাপাশি বাংলার মানুষের ওর‌্যাল ন্যারেটিভ বা কথ্য ইতিহাসের মধ্যে জমিদারতন্ত্রের সাথে লালন সম্প্রদায়ের রীতিমতো লাঠালাঠির ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।’’ অবশ্য এই তৃতীয় অভিযোগটি সুনীল-এর উপন্যাসটি সম্পর্কে খাটে না। যদিও ঠাকুরবাড়ি সেখানে অনিবার্য অনুষঙ্গ, তবু কাহিনী বলার জন্য জমিদারের বজরায় লালনকে বসিয়ে ফ্লাশ-ব্যাক এ গল্প বলানো হচ্ছে না। বরং এরকম একটা ঘটনার বিবরণ আছে যে জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনী কাঙ্গাল হরিনাথের বাড়িতে হামলা করতে এলে লালন ও তার সঙ্গীরা লাঠি হাতে এসে তা প্রতিরোধ করেন। কল্লোল তার লেখার মন্তব্যগুলো ধরে সামহোয়ার ইন ব্লগ-এ আরও কিছু মন্তব্য করেছেন: ‘‘ছবির মূল ধান্দা বাণিজ্য; লালন দর্শন, লালন জীবন এইসব উপলক্ষ্যে মাত্র/লালন এখন বেশ নামী ব্রান্ড… [এটাকে] সাংস্কৃতিক-বাণিজ্যিক প্রকল্পের একটা মহড়া বলা যেতে পারে।’’

যাহোক, এই ‘খণ্ডিত’ ‘বিকৃত’ নির্মাণের প্রতিবাদ করে কল্লোল বলেন: ‘‘ছবির পরিচালক গৌতম ঘোষ কিংবা বাংলাদেশের প্রযোজনা সংস্থা ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও আশির্বাদ চলচ্চিত্র এবং ভারতীয় প্রযোজনা সংস্থা রোজভ্যালি কিংবা বাংলাদেশের কর্পোরেট নিবেদক বাংলালিংক এলিট শ্রেণীর কোনো মহানায়ক বা জাতীয় বীরকে নিয়ে এ ধরনের স্বেচ্ছাচার করার স্পর্ধা দেখাতো না, লালন নিম্নবর্গের নায়ক কিংবা জাতহীন বলেই, তাকে নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করা যায় কিংবা করানোও যায়। আর লালনকে নিয়ে এই যা ইচ্ছে তাই করা ও করানো এবং সেটাকে লালন দর্শন বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টাকে সাংস্কৃতিক জমিনের উপর চলমান কর্পোরেট, বহুজাতিক ও বিজাতীয় আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের নমুনা হিসেবেই দেখতে হবে এবং মোকাবিলা করতে হবে।’’

এই সমালোচনাগুলো নিশ্চিতভাবেই করা যায় সিনেমাটির বিরুদ্ধে এবং এর একটিও খারিজ করতে পারবেন না নির্মাতাগণ। লালন সম্পর্কে আমাদের যে জানাশোনা ও উপলব্ধি তার প্রতিফলন নেই সিনেমায়- এটাই সমালোচনাগুলোর ভিত্তি, একটা ‘অথেনটিক’ লালন চরিত্রের আকাঙ্ক্ষা এসব সমালোচনার ভিত তৈরি করে দেয়। তবে এ সমালোচনাগুলো স্পষ্ট করে তোলে না কোন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চায় এরকম একটা কাহিনী, কেনই বা এইভাবে কাহিনীটি নির্মিত হয়েছে, কেবলই কি সাংস্কৃতিক বাণিজ্যের ধান্ধা? এরকম রেপ্রিজেন্টেশনের রাজনীতিটা কোথায়? ‘অথেনটিক’ লালন নির্মাণে কতোটুকু ঘাটতি থেকে গেল সেই মাপজোখ করার বদলে আমাদের জন্য জরুরি হয়ে ওঠে বিচার করা, লালনকে নিয়ে এই আইকন নির্মাণ প্রকল্প কোন গাঙ বেয়ে চলেছে।

২

মনের মানুষ সিনেমায় আলো-আঁধারীর খেলা আছে, আছে লালনকে নিয়ে সাজানো কিছু ইমেজের উপস্থিতি, এবং প্রকৃত কিছু ইমেজের অনুপস্থিতি। এর ফলে, লালন যে প্রতিস্পর্ধী এক দার্শনিক-সামাজিক-রাজনৈতিক সাধনার অবস্থান নিয়েছিলেন, কিম্বা যেভাবে সামাজিক, ধর্মীয়, জাতিগত ক্ষমতাতন্ত্রকে অস্বীকার করেছিলেন তা হারিয়ে যায় এবং উপস্থিতি-অনুপস্থিতির খেলায় নির্মিত হয়ে ওঠে এক ঋষি লালন–যে কিনা হিন্দু-মুসলমানের মিলন প্রত্যাশী। বলা যায়, গৌতম ঘোষের লালনকে নির্মাণ করা হয়েছে ভারতীয় ‘হিন্দু’ মুনিঋষিদের অনুকরণে, মুসলিম ধারার সুফি-দরবেশদের অনুকরণে নয়। অথচ লালন, ‘‘বাহ্যতঃ মুসলমান ফকিরবৎ আচরণ করিলেও খুব সম্ভবত আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন নাই…’’।[১১] অসিতকুমার বন্দোপাধ্যায়ের জাতি নির্ধারণী উৎকণ্ঠিত অনুমান ‘‘খুব সম্ভবত আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন নাই’’-এর তাৎপর্যবিচার আপাতত পাশে সরিয়ে রেখে এটুকু নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে যে লালন ‘মুসলমান ফকিরবৎ’ আচরণ করতেন এবং তাঁর গানে কোরআন ও ইসলামী ভাবধারার নজির সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তথাপি, ফকির লালনকে সেরকম কোনো আচরণ করতে মনের মানুষ সিনেমায় আমরা দেখি না। গবেষক শক্তিনাথ ঝা শান্তিনিকেতন থেকে লালনের নির্ভরযোগ্য যে গানের খাতাটি উদ্ধার করেন এবং প্রথম পৃষ্ঠার ছবি ছাপেন, সেখানে বলা হচ্ছে: ‘‘শ্রী লালন শাহ দরবেসের তালেব শ্রী ভোলাই শা ফকির এই বহির মালিক’’।[১২] ‘দরবেস’ শব্দটির ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আরও কিছু তথ্যর দিকে আমরা নজর দিতে পারি। শক্তিনাথ ঝা বলেন, ‘‘মুসলমান জোলাগোষ্ঠী ছিল লালনের আত্মীয় এবং মূল আশ্রয়। অবিভক্ত নদীয়ার ছেউড়িয়ায় তিনি নানা জনকে নিয়ে এক নতুন পরিবার গঠন করেছিলেন।’’[১৩] তাছাড়া, ‘‘লালনের নামে প্রচলিত গানে কোথাও নিজেকে তিনি বাউল বলেননি। সাঁই, দরবেশ বলেছেন গুরুকে; নিজের পরিচয় ফকির; মত ও সাধনপন্থা ফকিরী, সহজ, রসসাধনা। লালনের শিষ্যরা গুরুকে সাঁই, দরবেশ বলেছেন।’’[১৪] লালনের মৃত্যুর পরে পাক্ষিক হিতকরী পত্রিকার প্রথম প্রতিবেদন, লালনের মৃত্যুর কিছুকাল পরে জলধর সেন, কিংবা উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যও তাঁকে ফকির হিসেবেই শনাক্ত করেছেন। উপেন্দ্রনাথের এই বাক্যটি প্রণিধানযোগ্য: ‘‘লালন ও বহুসংখ্যক ঐ মতাবলম্বী ফকির এবং গোঁসাই গোপাল ও অন্যান্য বহু বাউলপন্থী রসিক বৈষ্ণবের বাস ও লীলাস্থল এই কুষ্টিয়া অঞ্চল।’’[১৫] এই বাক্য থেকেও পরিষ্কার হয়ে ওঠে কুষ্টিয়া অঞ্চল লালনের সমসাময়িক কালে বাউলপন্থী সাধকদেরও উর্বর বিচরণ ক্ষেত্র ছিল এবং লালন নিজেকে সেই গোষ্ঠীভুক্ত করেননি। নদীয়ার জনসমাজে লালন ও তার অনুসারীদের বলা হতো ‘নেড়ার ফকির’ বা ‘বেশরা ফকির’।[১৬]

যে প্রশ্নটা করা দরকার তা হলো, বাউল পরিচয়ের বর্গে ফকির লালন শাহ/সাঁইকে চিহ্নিত করবার ইতিহাস কী, সে ইতিহাস জাতিসত্তার রাজনীতি ও জাতীয় সাংস্কৃতিক কল্পনায় কীভাবে অংশ নেয়? লালন স্বয়ং নিজেকে বাউল মনে করতেন না, নিজেকে বাউল বলে পরিচয়ও দিতেন না। একইসাথে, ফকির পরিচয় ব্যবহার করতে লালনের বা তার অনুসারীদের কোনো দ্বিধা ও কার্পণ্য করতেও দেখা যায় না। অনেক গানেই পদকর্তা হিসেবে স্বতঃসিদ্ধভাবে ব্যবহৃত লালন নামটির সাথে ‘ফকির’ ও ‘ফকিরি’ প্রত্যয় দুটি পওয়া যায়, ’বাউল’ প্রত্যয়টি কখনোই পাওয়া যায় না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের একজন বিখ্যাত পদকর্তা সাধক আব্দুল করিম শাহকে দেখি নিজের নামের সাথে বাউল প্রত্যয়টি হামেশা ব্যবহার করতে এবং ‘ফকির’ বা ‘ফকিরি’ প্রত্যয় দুটি এড়িয়ে চলতে। তিনি ‘ফকিরি’ সাধনায় যুক্ত নয় বলেই কি এটা ঘটে? এই পার্থক্যটুকু খুব সামান্য মনে হলেও, বাংলাদেশের ধর্ম ও রাজনীতির প্রতিসরণগুলো বুঝতে খুবই মূল্যবান পর্যবেক্ষণের বিষয় বলে মনে হয়। আব্দুল করিম শাহর গানে সাবলীলভাবে ‘বাউল’ পরিচয় ব্যবহারের ব্যাখ্যা কি আমরা ফকির লালন শাহের ‘বাউল সম্রাট’ হয়ে উঠবার ইতিহাসের মধ্যে খুঁজবো? আমরা অনুমান করতে পারি যে ‘ফকির’ পরাজিত শব্দ, এই পরিচয়বাচক শব্দটিকে সাধক পদকর্তার জবান থেকে এবং আমাদের মনোজগত থেকে হটিয়ে দিয়েছে পরিচয়বাচক ‘বাউল’ শব্দটি, যে-কারণে সাম্প্রতিক কালের সাধক আব্দুল করিম নিজের নামের সাথে ‘ফকির’ প্রত্যয়টি ব্যবহার না করে ‘বাউল’ পরিচয়টি ব্যবহার করেন। সুধীর চক্রবর্তী মনে করেন, ‘‘লালন পরবর্তী মৌলানা-মৌলবী এবং নৈষ্ঠিক হিন্দুবর্গ তাঁকে বাউল শ্রেণীভুক্ত করেছেন। তার একটা বড় কারণ হল, দুই বাংলার বাউল-ফকিররা লালনের গান সবচেয়ে বেশি গেয়ে থাকেন এবং তাঁর গানে নিজেদের মতকে প্রতিষ্ঠা করবার মতো অনেক যুক্তি ও তত্ত্বের ভিত্তি খুঁজে পান।’’[১৭] আর শক্তিনাথ ঝা মনে করেন, ‘‘আচার-ধর্ম এবং সাম্প্রদায়িক সীমানা লঙ্ঘনকারী ফকির-দরবেশগোষ্ঠীতে কালক্রমে শিষ্টদের অবজ্ঞাবাচক ও সাধকদের প্রতিবাদবাচক বাউল শব্দ গৃহীত হয়েছিল। লালনের জীবদ্দশায় সূচিত হয়েছিল বাউল, ন্যাড়ার ফকির-বিরোধী আন্দোলন। ফলত বাউল শব্দটি স্পষ্টতা লাভ করেছিল।’’[১৮] আমার মতে, এর সাথে যুক্ত করতে হবে গত অর্ধ শতকের ভদ্দরলোকী রাজনীতি, যা দরবেশ ফকিরি ধারার সাধককে টেনে নেয় বাউল বর্গে। এ বর্গে টেনে নেবার একটা প্রধান প্রণোদনা এসেছিল ১৯৪৭ এর দেশবিভাগের পরে, যখন লালনকে সুফি সাধক হিসেবে ইসলামী সাংস্কৃতিক বলয়ে আত্মীকরণের একটা প্রবল প্রচেষ্টা দেখা দিয়েছিল পূর্ব-পাকিস্তানে। বাংলাদেশের সেকুল্যারপন্থীরা দরবেশ ও ফকিরি তন্ত্র থেকে বিযুক্ত করে লালনকে ‘বাউল বর্গে’ প্রতিষ্ঠা করে ইসলামীকরণের হাত থেকে বাঁচানো গেছে বলে স্বস্তি বোধ করেছিলেন। এখনও করেন, যে-কারণে একালের খ্যাতিমান অধ্যাপক আনিসুজ্জামান মনের মানুষ দেখে নিশ্চিন্ত মনে ‘স্নাত’ হতে পারেন। কিন্তু সাপের ঘরেই তো ঘোগের বাসা থাকে! ‘বাউল’ বর্গে লালনকে প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে যে গলদ ছিল তার নালা বেয়েই লালনের জন্মবৃত্তান্ত ও জাত-পাত খোয়ানোর কাহিনী পল্লবিত হয়ে ওঠে। আর এখন সেই বাউল বর্গ থেকে তাঁকে টেনে নেয়া হচ্ছে হিন্দু ঋষির জগতে।

আমার বলার কথা এই যে, ফকির ও দরবেশ হিসেবে লালনকে শনাক্ত করা সম্ভব হলেও ‘বাউল’ হিসেবে শনাক্ত করা যায় না, ‘হিন্দু’ বাউল তো নয়ই। এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায় যে, লালন ছেঁউড়িয়ার মলম শাহের দেয়া চার একর জমির উপর আখড়া গড়ে সাধনা করেন। তথাপি, তিনি নিজেকে মুসলমান পরিচয়ে পরিচিত করা থেকে সযতনে বিরত থেকেছেন, হিন্দু পরিচয়েও নয়। কারণ, হিন্দু মুসলমান কোনো জাতের বর্গে তিনি অবস্থান করতে চাননি। অত্যন্ত সফলভাবে তিনি নিজের ও তাঁর সাধনসঙ্গী বিশোকার জাতপরিচয় গোপন করতে সক্ষম হন। ছেঁউড়িয়ায় কোথা থেকে এসেছিলেন, কী বিত্তান্ত সবই তিনি গোপন করেছিলেন- যা ফকিরি সাধনারই অংশ। ছেঁউড়িয়া-পূর্ব জনমের সব কাহিনীই কল্পিত, মনগড়া, উদ্দেশ্যমূলক।

কিন্তু এ উপমহাদেশে জাতিসত্তার রাজনীতি যখন হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের সীমানা সংহতকরণে প্রবল হলো গত শতকের বিশের দশক থেকে, সে সময় লালনের জাত-পরিচয় নির্ধারণ করাটাও যেন লালন গবেষকদের প্রধান কাজ হয়ে ওঠে। এ নিয়েই ভদ্দরলোকদের কাড়াকাড়ি লাঠালাঠি প্রকটিত হয়, লালনের জীবন ধর্ম-রাজনীতির লড়াইয়ের ময়দান হয়ে ওঠে। ফলে কল্পনার জাল শতমুখে বিস্তৃত হতে লাগলো। লালনকে নিয়ে জাতিসত্তার রাজনীতির তিনটা সুস্পষ্ট প্রতিসরণ দেখা যায় গত শতকের বিশের দশক থেকে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত। সে আলোচনায় এখানে যাবো না, বরং এটুকুই আমরা দেখব যে গৌতমের মনের মানুষও এই রাজনীতিতে অংশ নেয় এবং লালনকে কাঠামোবদ্ধ করে জাতিসত্তার রাজনীতির বিশেষ কিছু চিহ্ন ধরে। লালনের মৃত্যুর পনের দিন পরে পাক্ষিক হিতকরী পত্রিকায় একটা বেনামী লেখা ছাপা হয় লালনের মহাপ্রয়াণের ওপর। সেখানে মিথের বীজ বপন করা হয় যে, ‘সাধারণে প্রকাশ’ জাতিতে তিনি কায়স্থ ছিলেন এবং চাপড়ার ভৌমিকেরা তাঁর আত্মীয়। এইটুকু অনুসরণ করে বেশ কিছুকাল পরে মিথটিকে আরও পল্লবিত করে তোলেন শ্রী বসন্তকুমার পাল কলকাতার প্রবাসী পত্রিকায়। কবি জসিমউদ্দীন এর প্রতিবাদে লেখেন, ‘‘এমনকি তিনি লালনের পিতামাতার পরিচয় দিতেও কুণ্ঠিত হন নাই। আমরা কিন্তু লালনের গ্রামের কাহারো কাছে এরূপ বৃত্তান্ত শুনি নাই’’।[১৯] যে ভোলাই শাহের দোহাই দিয়ে বসন্তকুমার লালনের জন্মস্থান, পিতামাতা, জাত খোয়ানোর কাহিনী সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন, সেই ভোলাই শাহের কাছেই জসিমউদ্দীন জানতে চেয়েছিলেন এসব কাহিনীর সত্যাসত্য। ভোলাই শাহ জসিমউদ্দীনকে বলেন, ‘‘অনেকে তাঁর সম্বন্ধে অনেক কথাই বলে বটে, কিন্তু কেউ প্রকৃত ঘটনা জানে না’’।[২০]

মনের মানুষ সিনেমাটিতে মোল্লা ও পুরুতদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবার দৃশ্য আছে। তদুপরি, জাত খুইয়ে বিতাড়িত হয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নেবার পরে সোলেমান ওরফে কালু তাঁকে জিজ্ঞেস করে তার জাত কি, ‘হিঁদু না মোসলমান?’ লালন বলে, তার পরিচয় শুধুই ‘মানুষ’। একইভাবে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের কাছেও লালন বলে যে জগতে দুইটাই মাত্র জাত আছে, নারী আর পুরুষ এবং বাকি সব মানুষের অনাসৃষ্টি। এসব দেখে মনে হতে পারে যে লালনের এমন এক চরিত্র খাড়া করা হয়েছে যা জাত-পাতের প্রশ্নের উর্ধ্বে। কিন্তু মনোযোগ দিলে সুনীল-গৌতমের কৌশলী কাঠামো শনাক্ত করতে অসুবিধা হয় না। এর আদি উপকরণ হিতকরী পত্রিকা আর বসন্তকুমার পালরাই সরবরাহ করেছিলেন। মনের মানুষ সিনেমা যাত্রা শুরু করে এই কল্পিত জন্ম বৃত্তান্ত ও জাত খোয়ানোর মিথটি আশ্রয় করে এবং এমনভাবে পরবর্তী দৃশ্যসমূহ সাজানো হয় যে ফকিরি নেবার পরেও লালনকে ‘লালন চন্দ্র কর’ হিসেবে চিনতে অসুবিধা হয় না। এমনকি, গুরু সিরাজ সাঁইয়ের দৃষ্টিগ্রাহ্য উপস্থিতি ও অনুসরণ সত্ত্বেও লালনের গা থেকে হিন্দুত্বের গন্ধটুকু মোছে না। তবে, এই প্রচেষ্টার রূপ সাংস্কৃতিক, উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির খেলার মাধ্যমে লালনের এই রূপকল্প গড়ে তোলা হয়।

লালনের এ রূপকল্প চিনতে, আমরা মনের মানুষ সিনেমায় উপস্থিত ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে অনুপস্থিত রাখা কিছু ইমেজের প্রতি নজর করতে পারি। কৃষ্ণপ্রসন্ন কবিরাজের ঘোড়া লালু নিয়েছিল কিনা তা শনাক্ত করার জন্য কাজের মেয়ে বীনার ডাক পড়ে, সে চিনতে পারে, লালুর পরিচয় তার কাছে: ‘‘নিত্যবাবুর আখড়ায় যাত্রপালায় নেতাই সেজেছিল, দুহাত তুলে কী নাচ! খুব ভালো গান করতি পারে’’। এ দৃশ্যকল্প লালনকে পাটাতন দেয় গড়ে উঠবার। ঘোড়া সত্যিই চুরি করেছিল কিনা সেটা প্রমাণের জন্য ঘোড়ার পিঠে চড়ে দেখাতে বলে করিবাজ। কারণ তার ‘রানী কোনো অচেনা মানুষকে পিঠে রাখে না’। দেখা গেল ঘোড়াটি দিব্যি লালনের বশমানা। তাকে পিঠে রাখলো। ন্যারেটিভ-এ আইকন নির্মাণের এটা এক পরিচিত কৌশল। সিনেমায় দেখা যায়, ছোটবেলা থেকেই বাউল ফকিরদের প্রতি লালুর বিশেষ আগ্রহ ছিল, নিজেও গান বাঁধে। শুরুর দিকেই আমরা দেখি, কবিরাজ কৃষ্ণপ্রসন্ন সেনের সাথে কিশোর লালু গেছে গঙ্গাস্নানে। সন্ধ্যায় কবিরাজ মশাই তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বিশ্রাম করছেন, আর লালু গান শোনাচ্ছে, ‘‘আর আমারে মারিস নে মা/বলি মা তোর চরণ ধরে/ননী চুরি আর করবো না।’’ এটা লালনেরই গান- গোষ্ঠের রাখাল শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে এ গানের কাহিনী। আর এটাও মনে রাখতে পারি, কৃষ্ণপ্রসন্ন বাবু তাকে ঘোড়ার রাখাল হিসেবে সাথে নিয়ে গিয়েছেন গঙ্গাস্নানে। পরিচালক অন্য কোনো গান ব্যবহার করতে পারতেন, কিম্বা কোনো গান ব্যবহার না করেই দৃশ্যটা সাজাতে পারতেন। লেখক ও পরিচালকের ‘আমি’ সত্তাকে

মনের মানুষ, চিত্র ২: গঙ্গাস্নানে গিয়ে ঘোড়ার রাখাল লালু গাইছে ‘আর আমারে মারিসনে মা’

বিচারে নিলে আমরা দেখব এ গান ব্যবহার অনিবার্য ছিল। এ গান বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয় একারণে যে লালু এই গঙ্গাস্নানে গিয়েই বসন্ত আক্রান্ত হয় এবং সঙ্গীরা তাকে মৃত ভেবে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়। এবং এক মুসলমান নারী তাকে নদীবক্ষ থেকে উদ্ধার করে সেবাসুশ্রুষার মাধমে সুস্থ করে তোলেন। তাই এই ‘পরের মাকে’ লালন মা বলে ডাকে, আপন মায়ের গৃহে আর না-থেকে। দর্শক মনে লালনের জীবন ও শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে সাদৃশ্য তৈরিতে এ গান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে একথা বলা যায় এবং আমাদের কাছে স্পষ্ট করে তোলে পরিচালক লালনের কোন ইমেজ নির্মাণে অগ্রসর হচ্ছেন।

সেবাসুশ্রুষায় লালু কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠেছে। বসন্তরোগ তাকে প্রাণে না-মারলেও কেড়ে নিয়েছে স্মৃতিশক্তি। নিজের নাম-পরিচয়-ঠিকানা কিছুই মনে করতে পারে না। সিরাজ সাঁই এসেছে লালনের প্রাণদাত্রী রাবেয়ার কুটিরে। তার মনে হয় এর আগেও কোথায় যেন লালুর মুখ তিনি দেখেছেন। একদিন নদীর কূলে বসে লালু গান করছে, পাশে এসে সিরাজ সাঁই বসে: ‘‘এইতো মনে পড়েছে!’’ সে লালুকে ঝাঁকুনি দেয়, ‘‘মনে পড়ে তোর নাম?’’ হঠাৎ স্মৃতিশক্তি ফিরে আসে লালুর, গড়গড়িয়ে বলে দেয়: ‘‘লালন চন্দ্র কর’’। সুনীলের উপন্যাসে দেখা যায়, লালু সমাজ বিতাড়িত হয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নেবার পরে নতুন নাম ধারণ করে লালন। কিন্তু পরিচালক লালনকে কর বংশের ছেলে হিসেবে পুরো পদবীসহ প্রতিষ্ঠিত করে নেন। অকস্মাৎ স্মৃতি ফিরে আসায় হতচকিত কণ্ঠ দিয়ে শুধু লালু বা লালন নামটুকুই বেরিয়ে আসে না, পরিচালকের পরিকল্পনামতোই গলা দিয়ে বেরোয় ‘‘লালন চন্দ্র কর’’।

তো কৃষ্ণের মতো যে লালন চন্দ্র কর, বাবরি মসজিদ ধ্বংস-পরবর্তী এ দুনিয়ায় যিনি নিজেই একটা দর্শন, যা কিনা ধর্মীয় সহনশীলতার শিক্ষা দেয়, এবং সর্বোপরি, যিনি ‘বাঙালির প্রাণের ধন’, যার হাত হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলনের জন্য প্রসারিত, তিনি যবনের স্পর্শে জাত খোয়াতে পারেন বটে, কিন্তু সারাজীবন তো আর মুসলমানদের ঘরে বাস করতে পারেন না! তাই সুনীল ও গৌতম তাকে জঙ্গলে পাঠিয়ে দেন- নতুন সমাজ গড়বার জন্য।

মনের মানুষ, চিত্র ৩: জঙ্গলের ভিতরে শিমুলতলায় আনন্দনৃত্য


মনের মানুষ, চিত্র ৪: সাধুসঙ্গ নয়, বসে নাচ-গানের আসর

আর এই নতুন সমাজ গড়বার মহানায়কের আবির্ভাবের জন্য গোপন করতে হয় অনেক কিছু। ছেঁউড়িয়ায় মুসলমান জোলা সম্প্রদায়ের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়েই লালন তাঁর সাধকজীবন পার করেন। শিষ্যত্ব গ্রহণ করে মলম শাহ তাঁকে চার একর জমি দান করেন বসবাসের জন্য। সেখানেই লালনের আখড়া ও সমাধি। পাক্ষিক হিতকরী পত্রিকায় লেখা হয়েছিল: ‘‘লালন ফকীর নাম শুনিয়াই হয়ত অনেকে মনে করিতে পারেন ইনি বিষয়হীন ফকীর ছিলেন; বস্ত্ততঃ তাহা নহে; ইনি সংসারী ছিলেন; সামান্য জোতজমা আছে; বাটীঘরও মন্দ নহে। জিনিসপত্রও মধ্যবিত্ত গৃহস্থের মত। ইঁহার সম্পত্তির কতক তাঁহার স্ত্রী, কতক ধর্ম্মকন্যা, কতক শীতলকে ও কতক সৎকার্য্যে প্রয়োগের জন্য ইনি একখানি ফরমমাত্র করিয়া গিয়াছেন।’’[২১] এসব তথ্য তাই গোপন করতে হয়। গোপন করতে হয় পালিত কন্যা ও সাধনসঙ্গী, আর দেহসাধনাকে। কারণ ঋষি ইমেজ নির্মাণের জন্য এগুলো ঠিক মানানসই নয়। সিনেমায়, তার বদলে, লালনকে কেন্দ্র করে জঙ্গলের শিমুলতলায় তাই গড়ে ওঠে এক আনন্দবাজার, আর সব্বাই সেই সর্গে ‘আনন্দ করে’ দিন যাপন করে। লালন সমাজবিতাড়িত মানুষদের আশ্রয় ও নেতা হয়ে ওঠেন। হিন্দু-মুসলমান জাতপাতের বালাই নাই। তার কাজ কেবল সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন–পুরুত ঠাকুর ও মৌলভীদের–মোকাবিলা করা আর গান বাঁধা। সেখানে সাধু সঙ্গ নয়, বসে নাচ-গানের আসর। সেহেতু সেখানে সাধুরা আলেক (আল্লাহ এক) দেয় না, চাইল-পানি নিয়ে। কমলি ও ভান্তির জন্য তিনি সাধনসঙ্গী জুটিয়ে দেন। কমলি ঠাইরেন তার শরীর জাগাতে পারলেও মন জাগাতে পারেন না, ভান্তিকেও তিনি সাধনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন না। কারণ তিনি যে হিন্দু ঋষি! এজন্যই বোধকরি, বিশেষ বিশেষ সময়ে তিনি শাঁখ বাজান- যা হিন্দু পরিবারগুলোর নৈমিত্তিক ধর্মীয় চর্চার এক চিহ্ন হিসেবেই পাঠ করা সম্ভব।

মনের মানুষ, চিত্র ৫: লালন মাঝেমধ্যে শাঁখ বাজান

সুধীর চক্রবর্তী ব্রাত্য লোকায়ত লালন গ্রন্থে প্রশ্ন তুলেছেন: ‘‘লালন ফকিরের জীবন বিবরণ নিয়ে হালফিলের গবেষকদের এত আলো-আঁধারী, তাঁর কাব্যসত্য বা জীবনপ্রত্যয়কে একপাশে সরিয়ে রেখে তাঁর জন্মস্থান আর জাতিবর্ণ নিয়ে তর্ক ও বিতর্ক কেন প্রাধান্য পেয়ে গেল?’’[২২] তিনি এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজেননি। বরং আক্ষেপ করে বলেছেন: ‘‘লোকায়ত গুহ্যসাধনা অনেকটাই দেহবাদী আচরণঘটিত এবং তার বিশেষ অনুভব থেকেই উঠে আসে গান। এসব ক্ষেত্রে তাই সাধক-জীবনের বাহ্য ঘটনার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ব্যক্তির একান্ত সাধনার অতলতা। কিন্তু লালন সম্পর্কে আমাদের কৌতুহল বা অনুসন্ধান সম্পূর্ণ উল্টোপথে চলেছে।’’[২৩] এই উল্টোপথ বস্ত্তত রাষ্ট্র ও বাঙালি জাতির পরিচয় প্রশ্নের সাথে সম্পর্কিত–যা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক অভিলাষে পূর্ণ। সুনীল-গৌতমের নির্মাণের মধ্যে সেই অভিলাষেরই লালায়িত জিভ লকলকিয়ে ওঠে।

৩

মনের মানুষ, চিত্র ৬: ঠাকুরবাড়ির ফ্রেমের ভিতরে থেকে লালনকে দেখা

একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় বাংলাদেশের কোনো পরিচালক সিনেমা বানালে ঠাকুরবাড়ির ফ্রেমের ভিতর দিয়ে লালনকে দেখতেন না; অন্য কোনো পরিপ্রেক্ষিত, লালনের অন্য কোনো অবয়ব ফুটে উঠতো চলচ্চিত্রটি জুড়ে। গৌতম ঘোষের মনের মানুষ সিনেমাটিতে লালনের জীবনকাহিনীর জন্য ঠাকুরবাড়ি কেন মুখ্য হয়ে উঠল এই সওয়াল আমরা করতে পারি। সিনেমাতে দেখি, কুঠিবাড়িতে গভীর রাত পর্যন্ত জীবনকাহিনী বর্ণন শেষে লালনকে জমিদার জ্যোতিরিন্দ্রনাথ আখড়াটি ‘নিষ্কর হিসেবে পাট্টা’ লিখে দেবার জন্য নায়েব সচীন্দ্রনাথকে নির্দেশ দিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এরকম আশবাসের কাহিনী অনেক পল্লবিত হলেও কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। লালন গবেষক শক্তিনাথ ঝা অনেক বছর পরের একটা ঘটনা লিখেছেন: ‘‘রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লালনের নাম জড়িয়ে নানা ধরনের কল্প-কাহিনী রচনা করেছেন বিভিন্ন গবেষক, গ্রন্থাকার এবং উচ্চবর্গের ভদ্রলোকেরা। সর্বত্র ‘দাতা’ রবীন্দ্রনাথ, গ্রহীতা লালন। … জমিদারদের দিয়ে [লালনের] সমাধি বাঁধানোর চেষ্টা করেছিলেন মনিরুদ্দীন [শাহ]। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে জমিদাররা এতে কোন সাহায্য করেনি। … আর ভোলাই, মানিক শীতলের মৃত্যুর পর আখড়ার অনেক খাজনা বাকি পড়ে এবং জমিদারগণ ১৯৪৫-এর ১১ই ডিসেম্বর খাজনার জন্য আখড়াটি নিলামে তোলেন। লালনের শিষ্যরা ১ শত ৭ টাকা ৪ আনা দিয়ে নিলামে সম্পত্তি খরিদ করে আখড়ার অস্তিত্ব রক্ষা করেন। এ-বিষয়ে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।’’[২৪] আমরাও আর বাড়তি মন্তব্য করবার প্রয়োজন বোধ করছি না, বরং রবীন্দ্রনাথের লালন-পিরিতি সম্পর্কে আরেক গবেষকের মন্তব্য পাঠ করি এইখানে। সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘‘… একটা কথা ভাবলে আশ্চর্য লাগে যে, রবীন্দ্রনাথ প্রথম জীবনে লালন বা বাউল নিয়ে যেমন মেতেছিলেন পরবর্তীকালে তেমন উৎসাহী ছিলেন না। যদিও রবীন্দ্রনাথের নানা গানে বাউল গানের অন্তঃস্পন্দ শোনা যায়, তবু কোনো কারণে বাউলদের সম্পর্কে তাঁর প্রাথমিক উৎসাহে ভাঁটা পড়ে। … বাউলদের ‘মনের মানুষ’ তত্ত্বের ভাবালুতা তাঁকে এককালে যতটা উদ্বেলিত করেছিল পরে তাদের জীবনযাপনের মুক্ত ধরণ, বস্ত্তবাদ ও তর্কমুখী তাত্ত্বিকতা তাঁকে ততোটা টানেনি।’’[২৫] সহি বাত। আমাদের জন্য যে মার্গসংস্কৃতির প্রতিমা গড়েন রবীন্দ্রনাথ সেই প্রতিমার বেদী হিসেবেও বেশরা ফকির লালনের বস্ত্তবাদিতা, নারী-পুরুষের মুক্ত সম্পর্ক চর্চা কিংবা তর্কমুখিতা গ্রহণযোগ্য নয়। গ্রহণযোগ্য শুধু সেটুকুই যা মার্গসংস্কৃতির খাপে আঁটে। তবু যখন মনের মানুষ সিনেমায় ঠাকুর বাড়ির জানালার গরাদ ভেদ করে লালনের জীবনে প্রবেশ করতে হয়, তার ভিন্ন প্রয়োজন, ভিন্ন এক উদ্দেশ্য নজর এড়ায় না।

তাই বলছিলাম, জমিদার ঠাকুর পরিবারের জৌলুষ আরও বাড়িয়ে তোলার জন্যই মনের মানুষ সিনেমা এরকম ‘পাট্টা’ লিখে দেবার গুজবকে প্রতিষ্ঠিত করে- সেটা বলা যাবে না। বাঙালি সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথের পদচিহ্ন ধরে ধরেই আমাদের এগোতে হয়। আমরা দেখতে পাই, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে ঠাকুরবাড়ির ফ্রেম আর তার নিশানা ধরে লালনের জীবন বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। তাই বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ এমন এক আইকন যার সংস্পর্শে বেশরা ফকির লালন ‘‘বাঙালির প্রাণের সম্পদ’’ হিসেবে এই সিনেমা মারফত হিন্দু মধ্যবিত্তীয় পরিসরে আত্মসাৎ হয়ে যায়। তবে এটুকুও বলে রাখা দরকার যে, লালনের প্রাণস্পন্দন গোপন করেই কেবল মার্গ সংস্কৃতি তাকে হজম করার চেষ্টা করতে পারে। কারণ, তার প্রাণস্পন্দনটুকুর স্বীকৃতি দিতে হলে মার্গ সংস্কৃতিই বেসামাল হয়ে পড়বার আশঙ্কা থাকে। অতঃপর, এর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে সিনেমার শেষ দৃশ্যের দিকে নজর দিতে পারি আমরা। জমিদারবাড়ি থেকে বেরিয়ে লালন গগন হরকরার কুঠিতে শেষ রাতটুকু যাপন করেন। গগন তার নিজের একটা গান শোনায় লালনকে: ‘‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে।’’ গগনের এই গানে মনের মানুষের সন্ধান করা হলেও, আমরা অনেকেই জানি যে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের অন্তরে লুকিয়ে আছে এ গানের সুর। আমরা অনেকেই এটাও হয়তো জানি যে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ কোলকাতার ভদ্দরলোকেরা মেনে নেয় নি। তারা বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য উঠেপড়ে নেমেছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, বাংলার হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে বিভেদ তৈরির মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শাসক বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করে দেবার জন্য কার্জন সাহেব বাংলাকে দুইভাগ করেছেন। সরল পাঠে এ যুক্তি ঠিকই যে ঔপনিবেশিক শাসকদের এরূপ উদ্দেশ্য ছিল। তবে একথাও ঠিক যে, হিন্দু-মুসলমানের ভিতরে বিরাজমান প্রবল বৈষম্যপূর্ণ একটা আর্থ-সামাজিক বিন্যাস ছাই-চাপা রেখেই জাতীয়তাবাদী হিন্দু নেতৃত্ব বঙ্গভঙ্গ রদ করতে নেমেছিল। যে-কারণে, পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানেরা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সামিল হয়নি, তারা বরং কলকাতার বাবুদের আধিপত্য ও শোষণের বাইরে এসে ঢাকাকেন্দ্রীক মুসলমানদের নতুন এক অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখেছিলেন বঙ্গভঙ্গের ভিতরে। কলকাতার প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়। এই আন্দোলনে উৎসাহ যোগাতেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’’। এ গানে লুকিয়ে আছে, যুক্তবাংলার স্বপ্ন। আজকের জমানায় এই স্বপ্নের তাৎপর্য অনুধাবন করা আমাদের জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে।


মনের মানুষ, চিত্র ৭: মিলন হবে কত দিনে…

যাহোক, অবিভক্ত সোনার বাংলার প্রতি কোলকাতার ভদ্দরলোকদের এই ভালোবাসা কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৪৭-এ পূর্ববাংলার মুসলমানেরা একবাক্যে পাকিস্তানের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন, সে কথা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু এই সাম্প্রদায়িক দেশভাগে কলকাতার ভদ্দরলোকদের সাম্প্রদায়িক মনোভাবের অবদানও কম ছিল না। চল্লিশের দশকে জমিদারী আর কোনো লোভনীয় কারবার ছিল না, ফলে পূর্ব বাংলায় জমিদারীর বদৌলতে কোলকাতায় বাবুগিরি করা দুষ্কর হয়ে ওঠে। তদুপরি দেখা গেল, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলার ক্ষমতা নির্ধারিত হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের তাঁবে থাকতে হবে ‘অগ্রসর’ হিন্দু সম্প্রদায়কে। সুতরাং, দেশভাগের মাধ্যমে অন্তত অর্ধেক বাংলার ওপর কর্তৃত্ব রক্ষা করা সম্ভব হবে ভেবেও তারা দেশভাগ সমর্থন করে। তথাপি, যুক্তবাংলার স্বপ্ন, এক রোমান্টিকতা, এক রাবীন্দ্রিক ভাবালুতা এখনও আমাদেরকে আচ্ছন্ন রাখে। তাই চলচ্চিত্রটিতে দেখি, ভোর হয়, লালন কুটির থেকে বেরিয়ে পাশ দিয়ে বয়ে চলা কুয়াশা ঢাকা নদীবক্ষের দিকে তাকিয়ে থাকেন। দূরের প্রতিবেশী পাড়া থেকে আজানের শব্দ ভেসে আসে—যেন স্মরণ করিয়ে দেয় যে মুসলমানেরাও এদেশের বাসিন্দা, যদিও দূরের পাড়াগাঁয়ে তাদের বাস, তাদের উপেক্ষা করো না। আর তাই যেন লালন গেয়ে ওঠেন, ‘মিলন হবে কতো দিনে, আমার মনের মানুষের সনে।’ এখানেই সিনেমার সমাপ্তি ঘটে। আর আমাদেরকে একগাদা প্রশ্নের মুখোমুখি করে দেয়।

দুঃখের কথা হলো, এই মিলনের জন্য, নতুন বাঙালি সমাজ গড়বার জন্য মনের মানুষ সিনেমায় লালনের অবয়বজুড়ে জাত-পাত না-মানা একজন হিন্দু ঋষির প্রতিমা গড়ে তোলা হয়েছে। আমার আপত্তি লালনকে নিয়ে এই হিন্দু ঋষি-ইমেজ নির্মাণের বিরুদ্ধে। কারণ, গত শতকের ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে যেমন লালনকে শরিয়তী ধারার ‘সুফি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবার এক সাম্প্রদায়িক চেষ্টা সবার নজরে এসেছিল, গৌতম-সুনীলের প্রচেষ্টা তার-ই উল্টোপিঠ। ইসলামপন্থীদের প্রচেষ্ঠা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে সহজেই শনাক্ত হতে পারে আমাদের চোখে। কিন্তু গৌতম-সুনীলের প্রচেষ্ঠাকে আমরা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা বলে চিনতে পারি না। কারণ, সাধারণত প্রকাশের উপরিতল অধ্যয়ন করে আমরা মনে করি যে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা সবসময় কেবল ধর্মীয় ‘চিহ্ন’ বা ইস্যুগুলোকে আশ্রয় করেই প্রকাশিত হয়। কিন্তু, জাতিসত্তার রাজনীতিতে এটাও দেখা যেতে পারে যে, ধর্মীয় ‘চিহ্ন’ প্রতিস্থাপিত হয়ে সংস্কৃতি, শিক্ষা ইত্যাদি সাম্প্রদায়িকতার ‘চিহ্ন’ হয়ে উঠেছে, গত শতকের প্রথমার্ধে ‘নবজাগরিত সংস্কৃতিবান’ হিন্দু জনগোষ্ঠীর বেলায় যেরূপ হয়েছিল।[২৬] এসব সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টার সাম্প্রদায়িক ঝোঁক চেনা দরকার–বিশেষতঃ তা যখন একজন বেশরা ফকিরকে ‘বাঙালির প্রাণের ধন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে তার প্রাণস্পন্দনটুকুই হরণ করতে উদ্যত হয়। জাতি আর কাহিনীর যে কল্পনা আমাদের মনে উদয় হয় তার প্রকৃতি একইরকম- সময়ের মিথের ভিতরেই তার বাস। আর সে মিথ নির্মাণ প্রকল্পগুলো রাজনৈতিক অভিলাষে পূর্ণ।
ফুটনোট:

[১.] Homi K. Bhaba. ‘Introduction: narrating the nation’, in Her (ed) Nation and Narration. Rourledge. 2006. First published in 1993. P. 1.

[২.] গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল (২০০৮)। মনের মানুষ। আনন্দ পাবলিশার্স, কোলকাতা। পৃ. ১৯৬।

[৩.] প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৭।

[৪.] গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল (২০০৮)। মনের মানুষ। আনন্দ পাবলিশার্স, কোলকাতা।

[৫.] মাইনুল ইসলাম, গৌতম ঘোষের ‘‘মনের মানুষ’’, দৈনিক ইত্তেফাক, ডিসেম্বর ১০, ২০১০।

[৬.] Gautam Ghosh’s ‘Moner..’ wins Golden Peacock at IFFI, Outlook, Dec 2, 2010.

[৭.] মাইনুল ইসলাম, গৌতম ঘোষের ‘‘মনের মানুষ’’, দৈনিক ইত্তেফাক, ডিসেম্বর ১০, ২০১০।

[৮.] http://www.bbc.co.uk/bengali/multimedia/2010/12/101223_mk_moner_manush.shtml?

[৯.] সমরেশ মজুমদার, মনের মানুষ: তবু যা পাওয়া গেল চুমুক দিয়ে খাবার পরেও আলোড়িত থাকার মতো, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৬ মার্চ ২০১১, কোলকাতা।

[১০.] দিনমজুর নামে সাহোয়ার ইন ব্লগ-এ লেখাটি (http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29303065) ছাপা হয়েছে। ফেসবুকে কল্লোল মোস্তফা স্বনামে লেখাটি পোস্ট করেছেন।

[১১.] অসিতকুমার বন্দোপাধ্যায়। ১৯৬৬। বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত। ৩য় খন্ড। কলকাতা। পৃষ্ঠা ১২০৬-২১।

[১২.] শক্তিনাথ ঝা। ফকির লালন সাঁই: দেশ কাল শিল্প। সংবাদ, কলকাতা ১৯৯৫।

[১৩.] শক্তিনাথ ঝা। ফকির লালন সাঁই: দেশ কাল শিল্প। সংবাদ, কলকাতা ১৯৯৫। পৃ. ২০৩।

[১৪.] শক্তিনাথ ঝা। ফকির লালন সাঁই: দেশ কাল শিল্প। সংবাদ, কলকাতা ১৯৯৫। পৃ. ১৫৩।

[১৫.] আবুল আহসান চৌধূরী। ২০০৮। লালন সমগ্র। পাঠক সমাবেশ, ঢাকা। পৃ. ৭৩২।

[১৬.] আবুল আহসান চৌধূরী। ২০০৮। লালন সমগ্র। পাঠক সমাবেশ, ঢাকা। পৃ. ৭৩৮।

[১৭.] সুধীর চক্রবর্তী। ১৯৯২। ব্রাত্য লোকায়ত লালন। পুস্তক বিপণি, কলকাতা। পৃ. ৭০।

[১৮.] শক্তিনাথ ঝা। ফকির লালন সাঁই: দেশ কাল শিল্প। সংবাদ, কলকাতা ১৯৯৫। পৃ. ১৫৩।

[১৯.] জসিমউদ্দীন, লালন ফকির। আবুল আহসান চৌধূরী। ২০০৮। লালন সমগ্র। পাঠক সমাবেশ, ঢাকা। পৃ. ৭৬৪।

[২০.] জসিমউদ্দীন, ‘‘লালন ফকির’’, আবুল আহসান চৌধূরী (সম্পা)। ২০০৮। লালন সমগ্র। পাঠক সমাবেশ, ঢাকা। পৃ. ৭৬৪।

[২১.] মহাত্মা লালন ফকীর, পাক্ষিক হিতকরী, ১৫ কার্তিক ১২৯৭/৩১ অক্টোবর ১৮৯০। উদ্ধৃত, আবুল আহসান চৌধুরী (সম্পা)। ২০০৮। লালন সমগ্র। পাঠক সমাবেশ, ঢাকা। পৃ. ৭০৮।

[২২.] সুধীর চক্রবর্তী। ১৯৯২। ব্রাত্য লোকায়ত লালন। পুস্তক বিপণি, কলকাতা। পৃ. ৪৭।

[২৩.] সুধীর চক্রবর্তী। ১৯৯২। ব্রাত্য লোকায়ত লালন। পুস্তক বিপণি, কলকাতা। পৃ. ৪৭-৪৮।

[২৪.] হারামনি, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৬৪-৬৫, উদ্ধৃত, শক্তিনাথ ঝা। ফকির লালন সাঁই: দেশ কাল শিল্প। সংবাদ, কলকাতা ১৯৯৫, পৃ. ১৭৫।

[২৫.] সুধীর চক্রবর্তী। ১৯৯২। ব্রাত্য লোকায়ত লালন। পুস্তক বিপণি, কলকাতা। পৃ. ৭২।

[২৬.] জয়া চ্যাটার্জী বেঙ্গল ডিভাইডেড: হিন্দু কমিউনালিজম এন্ড পার্টিশন, ১৯৩২-১৯৪৭ (কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস ১৯৯৪) গ্রন্থে এবিষয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। বিশেষত, দ্য কনস্ট্রাকশন অব ভদ্দরলোক কমিউনাল আইডেনটিটি: কালচার এন্ড কমিউনালিজম ইন বেঙ্গল অধ্যায়টি দেখা যেতে পারে।